প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় রেলে ঘটে যাওয়া ব্যাপক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই রূপান্তর কেবল নতুন রেলপথ এবং স্টেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সংযোগ, সুরক্ষা, যাত্রী সুবিধা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের নতুন পথ খুলে দিচ্ছে।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব উল্লেখ করেছেন ২০০৯-১৪ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের জন্য গড় বার্ষিক রেল বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪,৩৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে, ২০২৬-২৭ সালের বরাদ্দ তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৪,২০৫ কোটি টাকা। এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধি রাজ্যের রেল পরিকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতিকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
advertisement
এই বর্ধিত বিনিয়োগ রাজ্যে ব্যাপক পরিকাঠামোগত রূপান্তর ঘটাচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯৩,০০০ কোটি টাকার রেল প্রকল্প চালু রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন ট্র্যাক নির্মাণ, স্টেশন পুনর্নির্মাণ, সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি। লক্ষ্য হলো রাজ্যের প্রতিটি অংশকে দ্রুততর এবং উন্নত রেল সংযোগের সঙ্গে যুক্ত করা।
রেলওয়ে স্টেশনগুলি হয়ে উঠছে আধুনিক ‘সিটি সেন্টার, বলছেন রেল মন্ত্রী। তিনি বলেন, যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে আরও আধুনিক, সুবিধাজনক এবং বিশ্বমানের করে তুলতে অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের রেলওয়ে স্টেশনগুলিকে বড় আকারে পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। এই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির অধীনে, রাজ্যে মোট ১০১টি রেলওয়ে স্টেশনকে প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকা আনুমানিক ব্যয়ে পুনর্নির্মাণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্টেশনগুলিকে উন্নত যাত্রী সুবিধা, আধুনিক পরিকাঠামো এবং আকর্ষণীয় অথচ কার্যকরী ডিজাইনের সঙ্গে আপগ্রেড করা হচ্ছে যাতে সেগুলি পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলির জন্য ‘সিটি সেন্টার’ হিসেবেও বিকশিত হতে পারে।
এখন পর্যন্ত রাজ্যের নয়টি রেলওয়ে স্টেশনের পুনর্নির্মাণের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আনাড়া, বরাভূম, হলদিয়া, জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কল্যাণী ঘোষপাড়া, কামাখ্যাগুড়ি, পানাগড়, সিউড়ি এবং তমলুক। এগুলোর মধ্যে জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কল্যাণী ঘোষপাড়া এবং পানাগড়ের পুনর্নির্মিত স্টেশনগুলি ইতিমধ্যেই উদ্বোধন করা হয়েছে।
এই আপগ্রেড করা স্টেশনগুলি এখন উন্নত প্রতীক্ষালয়, উন্নত সাইনেজ ও আলোকসজ্জা, ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা, প্রশস্ত সার্কুলেটিং এরিয়া, ফুড কোর্ট, পার্কিং সুবিধা, যাতায়াতের সুবিধার জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, লিফট এবং এসকেলেটর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নান্দনিকভাবে ডিজাইন করা স্টেশন বিল্ডিং সরবরাহ করছে। এই সুবিধাগুলি যাত্রীদের জন্য রেল ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক, নিরাপদ এবং মনোরম করে তুলছে।
আধুনিক ট্রেন পরিষেবাগুলিতে সুযোগ বৃদ্ধি
রাজ্যে সংযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং যাত্রীদের আধুনিক রেল পরিষেবা প্রদান করতে প্রিমিয়াম ট্রেন পরিষেবাও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারতীয় রেল পশ্চিমবঙ্গকে দেশের প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে বেশ কিছু আধুনিক ও হাই-টেক ট্রেন পরিষেবা পরিচালনা করছে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক জোড়া বন্দে ভারত স্লিপার এক্সপ্রেস পরিষেবা চালু রয়েছে, যা দূরপাল্লার ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক ও সুবিধাজনক করে তুলেছে। এ ছাড়া আঠারোটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং বাইশটি অমৃত ভারত এক্সপ্রেস পরিষেবা রাজ্যের প্রধান শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করছে। এই ট্রেনগুলো যাত্রীদের দ্রুততর, আধুনিক এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
এই পরিষেবাগুলি চালু হওয়ায় ভ্রমণের সময় কমেছে এবং বিশ্বমানের রেল ভ্রমণ নাগরিকদের হাতের নাগালে এসেছে। এগুলি রাজ্যের প্রধান শহর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সংযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, যার ফলে আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হচ্ছে।
রাজ্যে রেলের নতুন রূপ
পশ্চিমবঙ্গ রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সাক্ষী হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে রাজ্যে প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সম্পূর্ণ রেল নেটওয়ার্কের চেয়েও বেশি। রেল বিদ্যুতায়নেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১,৭১২ কিলোমিটার রেল রুট বিদ্যুতায়িত হয়েছে এবং রাজ্যের রেল নেটওয়ার্ক এখন ১০০% বিদ্যুতায়িত হয়েছে।
সুরক্ষা এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির জন্য রাজ্যে ৫০০-রও বেশি রেল ফ্লাইওভার এবং আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয় রেলের নিজস্ব ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কবচ’-এর সম্প্রসারণ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের ১০৫ রুট কিলোমিটার জুড়ে ইতিমধ্যেই কবচ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছে, যেখানে ১,০৪১ রুট কিলোমিটারে কাজ চলছে। সব মিলিয়ে ৩,২০০ রুট কিলোমিটার জুড়ে এটি কার্যকর করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের জন্য নতুন প্রকল্প ও পরিষেবা
পশ্চিমবঙ্গ রেলের উন্নয়নে আরও বেশি গতি পেতে চলেছে। অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে কামাখ্যাগুড়ি, তমলুক, হলদিয়া, বরাভূম, আনাড়া এবং সিউড়ির পুনর্নির্মিত রেলওয়ে স্টেশনগুলি শীঘ্রই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বোধন করবেন। এর পাশাপাশি বেলদা ও দাঁতনের মধ্যে তৃতীয় রেলপথ এবং কলাইকুণ্ডা ও কানিমহুলীর মধ্যে অটোমেটিক ব্লক সিগন্যালিং প্রকল্পটি জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হবে।
অতিরিক্তভাবে, পুরুলিয়া এবং আনন্দ বিহার টার্মিনাল (দিল্লি)-এর মধ্যে একটি নতুন এক্সপ্রেস ট্রেন পরিষেবার ফ্ল্যাগ অফ করা হবে। এই পরিষেবাটি পশ্চিমবঙ্গ এবং জাতীয় রাজধানীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সুবিধাজনক রেল সংযোগ প্রদান করবে।
