ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়, গাজিপুর থানা এলাকার বাস্তৌলি গ্রামে। খেলতে খেলতেই মাথায় আঘাত শিশুটি৷ প্রথমে সেটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে হয়েছিল, সেটিই পরে রূপ নেয় এক জটিল চিকিৎসা ও তদন্তমূলক রহস্যে। শেষ পর্যন্ত কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি (কেজিএমইউ)-তে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়৷
advertisement
শিশুর বাবা রমেশ পেশায় দিনমজুর৷ তাঁরই কন্যা বাড়ির ছাদের উপর টিনের ছাউনির নিচে তার দুই দাদা—সৌভাগ্য (৮) ও হিমাংশু (৭)-এর সঙ্গে খেলছিল। হঠাৎ একটি বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির মাথা থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। ছাদে গিয়ে পরিবার দেখতে পায়, যন্ত্রণায় কাঁদছে লক্ষ্মী এবং চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
খেলার সময় দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ভেবে পরিবার প্রথমে তাকে নিকটবর্তী বেসরকারি মেঘনা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা ক্ষত সেলাই করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সে অচেতন হয়ে পড়ে, আর পরিবারের সদস্যদের মনে সন্দেহ জাগে যে বিষয়টি খুবই গুরুতর।
রাতেই তাকে ডা. রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সিটি স্ক্যানে ধরা পড়ে চাঞ্চল্যকর সত্য—শিশুটির মাথার গভীরে একটি গুলি আটকে রয়েছে। হাসপাতালে শয্যা না থাকায় তাকে দ্রুত কেজিএমইউ-এর ট্রমা সেন্টারে রেফার করা হয়।
১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কেজিএমইউ-তে পৌঁছনোর সময় শিশুর অবস্থা ছিল সংকটজনক। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল এবং সে প্রায় সাড়া দিচ্ছিল না। নতুন করে করা সিটি স্ক্যানে শুধু গুলির উপস্থিতিই নয়, আরও ভয়াবহ একটি বিষয় সামনে আসে—গুলিটি স্থির ছিল না, বরং মস্তিষ্কের ভেতরে নড়াচড়া করছিল।
আরও পড়ুন: খাবার পরিবেশনে দেরি থেকেই রক্তারক্তি কাণ্ড! ছুরিকাঘাতে মৃত ২, গুরুতর আহত ১, গাজিয়াবাদে ভয়ঙ্কর ঘটনা
কেজিএমইউ-এর নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অঙ্কুর বাজাজ বলেন, “এটি আমাদের সামলানো সবচেয়ে কঠিন কেসগুলির একটি। গুলিটি এক জায়গায় স্থির ছিল না। বারবার অবস্থান বদল করছিল, যা অস্ত্রোপচারকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। সামান্য ভুল হলেই গুরুত্বপূর্ণ মস্তিষ্ক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।”
অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ায় নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. বি কে ওঝার নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়। দলে ছিলেন পাঁচজন সিনিয়র নিউরোসার্জন, অভিজ্ঞ অ্যানাস্থেটিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞরা।
গুলির নড়াচড়া বন্ধ করে আরও ক্ষতি এড়াতে প্রথমে শিশুটির মাথার নির্দিষ্ট স্থানে নয়টি বিশেষ সূঁচ প্রবেশ করিয়ে গুলিটিকে স্থির করা হয়—একটি বিরল ও অত্যন্ত জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি। এরপরই শুরু হয় গুলি বের করার অস্ত্রোপচার।
প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে চলে এই অপারেশন। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বিপজ্জনক। সামান্য ভুলেই পক্ষাঘাত, স্থায়ী মস্তিষ্ক ক্ষতি বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত। তবে ভোরের দিকে চিকিৎসক দল সফলভাবে গুলিটি বের করতে সক্ষম হন।
এরপর শিশুকে প্রায় এক সপ্তাহ আইসিইউতে রেখে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরবর্তী ৪০ দিনে ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হয়। চিকিৎসকদের মতে, সে এখন সচেতন, স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং বড় কোনও স্নায়বিক সমস্যা দেখা যায়নি। আগামী দু’দিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
ডা. বাজাজ বলেন, “এই কেসটি আরও উল্লেখযোগ্য কারণ এত জটিল অস্ত্রোপচার ৪০ হাজার টাকারও কম খরচে সম্পন্ন হয়েছে। শিশুটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের। এনজিও এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহায়তায় আমরা নিশ্চিত করেছি, অর্থের অভাব যেন চিকিৎসার পথে বাধা না হয়।”
একদিকে যখন চিকিৎসকরা শিশুটির প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করছিলেন, অন্যদিকে পুলিশ পড়ে যায় এক কঠিন প্রশ্নের মুখে—এই গুলি এল কোথা থেকে?
তদন্তকারীরা ছাদে টিনের ছাউনিতে একটি গুলির চিহ্ন পেয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় গুলিটি ধাতব ছাউনিটি ভেদ করে শিশুটির মাথায় লাগে। চিকিৎসকদের মতে, এতে গুলির গতি কিছুটা কমে যায় এবং সেটাই সম্ভবত শিশুটির প্রাণ বাঁচিয়েছে। তবে পরিবার বা আশপাশের বাড়িতে কোনও লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি। না ছিল কোনও উদযাপনমূলক গুলিবর্ষণ, না মিলেছে স্পষ্ট কোনও শ্যুটারের খোঁজ।
এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “এটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর একটি মামলা। দূর থেকে ছোঁড়া গুলি (stray firing)-সহ সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত কোনও নিশ্চিত সূত্র পাওয়া যায়নি।” এদিকে লক্ষ্মীর বাবা রমেশ গাজিপুর থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, “আজও আমরা জানি না কে গুলি চালিয়েছে বা কেন। শুধু এটুকু জানি, চিকিৎসকদের জন্যই আমার মেয়ে আজ বেঁচে আছে।”
এই মুহূর্তে গুলি বের করা হয়েছে, শিশুটি সুস্থতার পথে এবং তাত্ক্ষণিক বিপদ কেটে গিয়েছে। কিন্তু খেলারত এক শিশুর ওপর কোথা থেকে নেমে এল এই প্রাণঘাতী গুলি—সে রহস্য এখনও পরিবার ও তদন্তকারীদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
