লিফটে আটকে মৃত্যু—এই একটি ঘটনাই যেন খুলে দিয়েছে আর জি কর হাসপাতালের পরিকাঠামোর এক অস্বস্তিকর চিত্র। অভিযোগ, যে ২ নম্বর লিফটে আটকে গিয়ে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে, সেটিতে আগেই প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল। তবুও সেটি বন্ধ না করে চালু রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রোগী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে।
রোগীর আত্মীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, লিফটটির দরজা ঠিকমতো বন্ধ হত না, ধীরে খুলত, এবং মাঝেমধ্যে আটকে যেত। এমনকি লিফটে কোনও অপারেটর বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীও থাকত না। অভিযোগ, একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
advertisement
ঘটনার দিন লিফটটি বেসমেন্টে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে ছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু হয়নি বলেই অভিযোগ। বেসমেন্টে নামার সিঁড়ির গেটেও তালা ঝুলছিল, এবং সেই চাবি কার কাছে ছিল, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
মৃতের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বহু অনুরোধের পরও কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দমকল ডাকার কথাও বলা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে দেরিতে এসে লিফট ভেঙে উদ্ধার করা হয়, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
অন্য রোগীর আত্মীয়দের অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। তাঁদের দাবি, লিফটগুলিতে কোনও লিফটম্যান থাকে না, অভিযোগ জানালেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমনকি অনেক সময় কর্মীদের অসতর্কতাও চোখে পড়েছে বলে অভিযোগ।
এই ঘটনার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—
লিফটে সমস্যা জানা সত্ত্বেও সেটি চালু রাখা হয়েছিল কেন?
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা গেল না কেন?
বেসমেন্টে যাওয়ার পথ তালাবদ্ধ ছিল কেন?
লিফটে প্যানিক বাটন বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি?
লিফটম্যান বা নিরাপত্তারক্ষী অনুপস্থিত ছিলেন কেন?
এদিকে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, তিনি পলিট্রমা বা বহুবিধ আঘাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর শরীরে ক্রাশ ইনজুরি ছিল—অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন অংশ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সন্দেহ করা হচ্ছে, লিফটের দরজার চাপেই তাঁর বুকে মারাত্মক আঘাত লাগে, ফলে পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডে গুরুতর ক্ষতি হয়। মাথাতেও আঘাতের চিহ্ন মিলেছে, আঙুলের হাড়ও ভেঙে গিয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, পরিবারের অভিযোগ স্পষ্ট—এই মৃত্যু এড়ানো যেত, যদি সময়মতো সাহায্য পৌঁছত। তাঁদের দাবি, লিফটম্যান উপস্থিত থাকলে কিংবা দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই মর্মান্তিক পরিণতি হত না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গাফিলতির কথা আংশিক স্বীকার করেছে। মেডিক্যাল সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ পিডব্লিউডি ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের অধীনে হয় এবং নিয়মিত রিপোর্ট আপডেট করা হয়। পুরো ঘটনার তদন্ত করে প্রযুক্তিগত ত্রুটি চিহ্নিত করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
