১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল জন্ম মুকুল রায়ের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসির ডিগ্রি, তারপর ২০০৬ সালে পাব্লিক অ্যাডমিনিসট্রেশন নিয়ে মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন। তবে ততদিনে তিনি বাংলার রাজনীতির পরিচিত মুখ হয়ে গিয়েছেন।
কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন মুকুল। ১৯৯৮ সালে যখন জাতীয় কংগ্রেস ভেঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন, তখন ছায়াসঙ্গীর মতো মমতার পাশে ছিলেন মুকুল রায়। একসময়ে তৃণমূলের তিলজলার পার্টি অফিসে সপরিবারে থাকতেন। জেলা থেকে শহর, প্রতিটি ব্লক বা বুথ স্তরে পরিচিতি ছিল তাঁর। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন মুকুল রায়। তৃণমূল স্তরে গিয়ে সংগঠন করেছিলেন মুকুল। ২০০৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয় তাঁকে। দলের ‘সেকেন্ড ইন কম্যান্ড’ ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার জগদ্দল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন । তবে হেরে যান ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী হরিপদ বিশ্বাসের কাছে। কিন্তু থেমে থাকতে জানতেন না মুকুল। ২০০৬ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন। দিল্লিতে তৃণমূলের মুখ ছিলেন রাজনীতিবিদ। ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ছিলেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন তিনি।
advertisement
দ্বিতীয় ইউপিএ জমানায় জাহাজ মন্ত্রী হন মুকুল রায়। ২০১২ সালে রেল বাজেটে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষের কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফা দাবি করেন। দীনেশ ত্রিবেদী ইস্তফা দিলে মুকুল রায় পরবর্তী রেলমন্ত্রী হন। ২০১৫ সাল থেকেই মুকুলের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব তৈরি হয়। এর পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এবং বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়র সঙ্গে বৈঠক করায় মুকুলকে ৬ বছরের জন্য সাসপেন্ড করে তৃণমূল। বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার আগে ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর রাজ্যসভার সদস্য পদ ছাড়েন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী।
২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর, আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপি-তে যোগ দেন মুকুল রায়। ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত ও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে গেরুয়া শিবিরের হয়ে মুকুল বড় ভূমিকা নিলেও তাঁকে কোনও পদ দেয়নি বিজেপি। বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার প্রায় ৩ বছর পরে ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পর থেকেই কিছুটা পিছনের সারিতে চলে যান মুকুল।
ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পরে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রবীন নেতা। স্ত্রী কৃষ্ণাও কোভিড পজিটিভ ছিলেন। ২ জুন কৃষ্ণা রায়কে দেখতে হাসপাতালে যান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধরণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরু হয় মুকুল-জায়ার অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি। অভিষেক হাসপাতালে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কৃষ্ণা রায়কে দেখতে যান দিলীপ ঘোষ। পর দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোন পান মুকুল রায়। ১১ জুন, ২০২১। তপসিয়া তৃণমূল ভবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে ফিরে আসেন তাঁর পুরানো দলে।
২০২১ সালের ১১ জুন তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন মুকুল রায়। ২০২১-এর ২৫ জুন তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার দ্বারা PAC- এর সদস্য নির্বাচিত হন এবং সেই বছরই ১৪ জুলাই PAC-এর চেয়ারম্যান হন। অসুস্থতার কারণে ২০২২ সালের ২৭ জুন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের জন্য পদত্যাগপত্র জমা দেন মুকুল রায়।
বিধানসভায় মুকুল রায়ের দলত্যাগ মামলা নিয়ে মোট ১২ টি শুনানি হয়। সেই দীর্ঘ শুনানি পর্বের পর স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, মুকুল রায় দলত্যাগ করেননি। তিনি বিজেপিতেই রয়েছেন।
পরবর্তীতে বিধানসভার অধ্যক্ষের এই রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে যান বিজেপি বিধায়করা। আদালতের তরফ থেকে বিধানসভার অধ্যক্ষকে বলা হয়, প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার জন্য। সে ক্ষেত্রে বিজেপি-র বক্তব্য ছিল, তাঁদের কাছে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বেশ কিছু ছবি ও নথিপত্রও জমা দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২২ সালের ৮ জুন, দলত্যাগের সেই অভিযোগ আবারও খারিজ করে দেন বিধানসভার অধ্যক্ষ। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করে। কলকাতা হাই কোর্ট খারিজের রায় দিলেও সেই সিদ্ধান্তের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
অবশেষে…সব শেষ! বর্ণময় কেরিয়ার,বেরঙিন বিদায়! ‘চাণক্যের’ চির প্রস্থান,আড়ালেই ঝরে গেলেন বঙ্গ রাজনীতির ‘মুকুল! হাজার চরাই-উতরাই, আলোচনা-সমালোচনার ঊর্দ্ধে, রাজনীতির ময়দানে ‘বিধায়ক’ হিসাবেই যাত্রা শেষ করলেন এক সময়ের ‘বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য’।
