মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে তখন ৷ আর এদিকে আমরাও আকাশবাণীতে তখন পুরো মাত্রায় কাজ করে চলেছি ৷ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ ৷ প্রণব এসে ঝটপট লিখে দিচ্ছেন বিভিন্ন খবর ৷ আর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সেই খবর দরাজ গলায় সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন ৷ এরই সঙ্গে আমরাও বিভিন্ন ধরনের রূপক অনুষ্ঠান বা ফিচার পোগ্রাম করে চলেছি ৷ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে চলছে জোরদার প্রচার ৷ পাকিস্তানের বিভিন্ন অমানবিক কার্যকলাপ ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও তখন চলছে চরমে ৷
advertisement
কলকাতা থেকে আকাশবাণী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা হিসেবে ৷ আকাশবাণী থেকে প্রথম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্র প্রচার করা হয়েছিল। সরাসরি ময়দানে উপস্থিত না হয়েও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার মনোবল বাড়িয়ে তুলেছিল এই আকাশবাণী। যুবসমাজকে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করার সেই প্রচেষ্টার কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয় ৷
• সেই সময় আকাশবাণীর অফিসে ঢুকলে ঠিক কেমন বোধ করতেন ?
একবারের জন্যও মনে হত না যে, আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নেই ৷ মনে হত, আমরা রণাঙ্গণেই দাঁড়িয়ে ৷ আমাদের হাতে শুধু বন্দুকটা নেই ৷ আক্রমণ প্রতিহত করছি আমরা ৷ রুখে দিচ্ছি পাকসেনাদের ৷ অস্ত্র রয়েছে আমাদের হাতে ৷ আর আমাদের অস্ত্র হল মাইক্রোফোন আর কলম ৷
যতোটা সম্ভব দিন-রাত জেগে প্রাণ উজাড় করে আকাশবাণীর প্রত্যেকটা কর্মী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বাধীনতা আনার ৷ একটা নতুন সূর্ষ দেখার সেই শপথের কথাগুলো আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় ৷
• মুক্তিযুদ্ধের প্রচারকার্যটা ঠিক কেমনভাবে হত ?
আমাদের কাজটা ছিল অফিসের ভিতর ৷ পুরো বিষয়টায় অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল ৷ যাঁর যেটা দায়িত্ব, তিনি শুধু সেইদিকেই নজর দিতেন ৷ তবে শোনা যায়, কলকাতার মুজিবনগরে থেকে প্রচার চলত ৷ আর আকাশবাণীর প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়াররা তাঁদের সেই সব কথা ছড়িয়ে দিতেন ৷ এগুলোর কোনওটাই আমরা জানতাম না ঠিকই, তবে সবাই ভীষণভাবে জড়িত ছিলাম ৷ এবং শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যা পর অধুনা বাংলাদেশে হত্যালীলা চলেছিল ৷
• তখন ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ?
গর্জে উঠেছিলাম আমরা ৷ প্রায় হুমকির স্বরে আকাশবাণীর তরফে জানানো হয়েছিল, ভারত কিন্তু চুপ করে বসে থাকবে না ৷ ভারত সমস্ত ঘটনার প্রতি লক্ষ্য রাখছে ৷ এখনই যেন সংযত হন, যারা এই ন্যক্করজনক কার্যকলাপের পিছনে রয়েছে ৷
অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে ছিল আমরা ৷ যাঁরা সে সময় রেডিওতে কাজ করতাম, মনে হত যেন আমারও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সামিল ৷ নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে আমরা আবেগতাড়িত হয়ে পড়তাম ৷
• যে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনি শুনতেন, স্টুডিওর ভিতরকার পরিবেশটা কেমন থাকত ?
আমরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে কাজ করতাম ৷ মুক্তিযোদ্ধারা যখন তাঁদের উপর, তাঁদের পরিবার এবং আশপাশের মানুষজনের উপর অত্যাচারের কথা বলতেন ৷ চোখ ফেঁটে কান্না আসত ৷ আর তা থেকেই একটা চাপা রাগের জন্ম হত ৷ সবাই আরও কঠোরভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার উৎসাহ পেতাম ৷
• সেই সময় কাজের একটা টুকরো বর্ণনা দিন না...
ওপার বাংলা তখন ছিল অবরুদ্ধ, বার্তা প্রচার করা হত। এমনকী সে দেশে আকাশবাণী শোনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানুষদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। তখনই এগিয়ে আসে আকাশবাণী। সংবাদের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বাহিনীর সাহস জোগানো, মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত। স্বভাবতই সত্য ঘটনা জানতে কোটি কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে আকাশবাণীর ওপরই।
সারাদিন ধরেই তখন রেডিওতে অন্যান্য মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ সম্প্রচারিত হত। তবে সব থেকে বেশি টানত রাত ১০টা থেকে ১০টা ৩০ মিনিটের সংবাদ। মোট তিনটি ভাগে ভাগ করে সংবাদ পরিবেশন করা হত। প্রথম পাঁচ মিনিট 'সংবাদ পরিক্রমা', পরের দশ মিনিট 'স্থানীয় সংবাদ', শেষ পনের মিনিট 'সংবাদ বিচিত্রা'। আধা ঘণ্টার ওই অনুষ্ঠানের সময় কেউই রেডিওর পাশ থেকে নড়তেন না। সারাদিনের কাজ শেষে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে রেডিওর সামনে বসতেন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। 'আকাশবাণী খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, কিংবা উপেন তরফদারের দীপ্তকণ্ঠে 'আকাশবাণী কলকাতা আপনারা শুনছেন 'সংবাদ বিচিত্রা' সে সময় বহু মানুষকেই উজ্জীবিত করেছিল।
• বঙ্গবন্ধুর ভাষণও তো আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হয়েছিল...
সেদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার জনসভায় দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে সেই বিখ্যাত ভাষণ দিলেন 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম.... '। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ শুনে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আকাশবাণীর কর্মীদের রক্তও টগবগ করে ফুটছে। সেদিন বিকালেই ঠিক হল রাতের খবরে বঙ্গবন্ধুর সেই বক্তৃতার সঙ্গে গান যোগ করে সংবাদ পরিবেশন করা হবে। সেই মতো কাজ শুরু হয়ে গেল। উপেনবাবু, দেবদুলালবাবু, বাংলাদেশের এক সংগীতশিল্পী কামরুল হাসান, এপার বাংলার সংগীতশিল্পী অংশুমান রায়, গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
সবাই মিলে বসে একটি গান তৈরি করা হল। এরপর কিছুটা বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ, কিছুটা গান, এভাবে সে রাতের খবর পরিবেশন করা হল। তারপর সবটাই তো ইতিহাস। দুই বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল সেদিনকার সেই সংবাদ। বহু মানুষের গায়ে কাঁচা দিয়েছিল, স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছিল সেই সংবাদ।
• আর যেদিন সেই জয় এল...
শুধু একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে একটি রাষ্ট্রের জন্ম এটি একটি বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিলিত প্রয়াসে এই জয় এলেও আকাশবাণীরও একটি বিরাট ভূমিকা ছিল। রেডিওতে বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর অকথ্য অত্যাচারের কাহিনি শুনেই অসংখ্য যুবক-যুবতী সেই নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন ঘোষণা করলেন 'বাংলাদেশ এখন স্বাধীন'-তখন সে এক অন্য অনুভূতি। আমরা যারা রেডিও স্টেশনের ভেতরে কাজ করছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত উপরে তুলে ধরে চিৎকার করে বললাম 'জয় বাংলা'।
