প্রয়াত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পুত্র মুজতবা খামেনেই। সূত্রের দাবি, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে মুজতবার নাম নিয়ে একপ্রকার ঐকমত্য তৈরি হলেও দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভিতরে বিভাজন এখনও স্পষ্ট। ফলে নেতৃত্বের রদবদল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হলেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন চলতেই পারে।
advertisement
ইরানের শক্তিশালী ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ভোটাভুটি হয়ে গিয়েছে বলেও কয়েকজন ইরানি ধর্মগুরু ও কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নেতৃত্ব বদলের সিদ্ধান্ত কার্যত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেরি হচ্ছে।
এই ক্ষমতার সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছেন আলি লারিজানি। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত লারিজানির রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় প্রভাব এখনও প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে যথেষ্ট শক্তিশালী।
মুজতবা খামেনেইকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণার সম্ভাবনা সামনে আসতেই লারিজানি ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে বলে খবর। ঘালিবাফকে মুজতবার সমর্থক বলেই মনে করা হয়। বিভিন্ন সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই শিবিরের দ্বন্দ্বই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একজন অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তি পরিস্থিতিকে ‘গভীর বিভাজন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে বাস্তবে কারা প্রভাব বিস্তার করবে, তা নিয়েই মূল সংঘাত তৈরি হয়েছে।
মুজতবা খামেনেইকে সামনে আনার সম্ভাবনা ইরানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একাংশের মধ্যেও মতাদর্শগত প্রশ্ন তুলেছে। কয়েকজন প্রবীণ ধর্মগুরু আশঙ্কা করছেন, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের ছেলেকে সেই পদে বসানো হলে তা বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো দেখাতে পারে। এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান—ধর্মীয় বৈধতা ও বিপ্লবী শাসনের দাবি—প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে, অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে নেতৃত্বের দৌড় থেকে প্রায় ছিটকে গেলেও আলি লারিজানি আবারও নিজের রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী লারিজানি পরিবার তাঁদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যোগাযোগের জোরে আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছে পৌঁছতে চাইছে।
কিছু সূত্রের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল তা দমনের পরিকল্পনায় লারিজানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিতরে নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের ধর্মীয় ও নিরাপত্তা নেতৃত্ব—যার মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ও বিভিন্ন নিরাপত্তা পরিষদও রয়েছে—একটি ‘নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা পরিবর্তনের মডেল’ তৈরির চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। তাদের মূল লক্ষ্য, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময়ে যেন কোনও প্রকাশ্য ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি না হয় এবং শাসনব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকে।
ইরান বর্তমানে এক জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি। দেশে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, তেল শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উপর হামলা এবং আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই ক্ষমতার লড়াই সামনে এসেছে।
ইরানের নেতৃত্বের ধারণা, এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী শক্তি ও বিদেশি প্রতিপক্ষরা বৃহত্তর আন্দোলন উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই শাসকগোষ্ঠীর কাছে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য দেশের ভিতরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একতাবদ্ধ নেতৃত্বের বার্তা দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, মুজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হলেও লারিজানি ও অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ক্ষমতার ভিতরের লড়াই এখনও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
