গত ৩ এপ্রিল মার্কিন বায়ুসেনার একটি একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানকে ধ্বংস করে ইরান৷ দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের পাহাডি় এলাকায় ওই যুদ্ধবিমানটি ভেঙে পড়ে৷ দুই আসন বিশিষ্ট ওই বিমানটির চালককে সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার করতে পারে সক্ষম হয় মার্কিন বাহিনী৷ কিন্তু যুদ্ধবিমানে থাকা উইপনস সিস্টেমস অফিসারকে খুঁজে বের করতে দু দিন সময় লেগে যায়৷
advertisement
ইরান ঘোষণা করে, মার্কিন বায়ুসেনার ওই অফিসারের খোঁজ দিতে পারলে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে৷ মার্কিন বায়ুসেনার অফিসারকে খুঁজে বের করতে দেশের সাধারণ মানুষকেও তল্লাশিতে অংশ নিতে অনুরোধ করে তারা৷
শেষ পর্যন্ত রবিবার কর্নেল পদমর্যাদার ওই অফিসারকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় মার্কিন সেনা৷ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায়, আমেরিকার ইতিহাসে এটিই ছিল সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ তল্লাশি এবং উদ্ধার অভিযান৷ এই তল্লাশি অভিযানের উপরে ভিত্তি করে একদিন হলিউডে সিনেমাও তৈরি হবে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প৷ কিন্তু শত্রু ডেরায় মার্কিন বায়ুসেনার ওই অফিসার কীভাবে ৪৮ ঘণ্টা কাটালেন, সেই ঘটনাক্রম রূদ্ধশ্বাস গল্পকেও হার মানাবে৷
কীভাবে শত্রু ডেরায় ৪৮ ঘণ্টা কাটালেন ওই মার্কিন বায়ুসেনার অফিসার?
আমেরিকা এবং ইরানের সেনাবাহিনী যখন তাঁকে হন্যে হয়ে খুজছিল, তখন শত্রুপক্ষের থেকে বাঁচতে একটি পাহাড়ি খাঁজে লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন বায়ুসেনার ওই কর্নেল৷ পাহাড়ি গা বেয়ে বেয়ে প্রায় ৭০০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে যান তিনি৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের নজর এড়াতেও দুর্গম এবং জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকাতেই লুকিয়ে ছিলেন তিনি৷
আত্মরক্ষার জন্য ওই মার্কিন বায়ুসেনার কর্নেলের কাছে একটি হ্যান্ড গান ছিল৷ আর ভরসা ছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর কঠিন প্রশিক্ষণ৷ প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা ওই বায়ুসেনা অফিসারের অবস্থান জানতে পারেনি আমেরিকাও৷ ওই কর্নেলের কাছে অবশ্য যোগাযোগ রক্ষার জন্য একটি যন্ত্র এবং তাঁকে চিহ্নিত করার জন্য একটি বিশেষ আলো ছিল৷
মার্কিন সেনার আধিকারিকরা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টা ইরানের পাহাড়ি এলাকায় সম্পূর্ণ একাই ছিলেন ওই কর্নেল৷ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিশেষ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ওই মার্কিন অফিসারের অবস্থান জানতে পারে সিআইএ৷ তারাই সেই তথ্য হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন এবং মার্কিন সেনাবাহিনীকে জানায়৷ এর পরই শনিবার রাত থেকে ওই কর্নেলকে উদ্ধারের প্রস্তুতি শুরু করে আমেরিকার স্পেশ্যাল ফোর্স৷
ট্রাম্প জানিয়েছেন, আহত অবস্থায় ওই কর্নেলকে উদ্ধার করা হলেও তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন৷ বায়ুসেনার ওই আধিকারিককে উদ্ধার করতে যাওয়া দলের কোনও সদস্যও আহত হননি বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প৷
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, মার্কিন সেনার ইতিহাসে স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম বার শত্রু শিবিরের ডেরা থেকে দু জন মার্কিন পাইলটকে আলাদা আলাদা জায়গা থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হল৷
SERE প্রশিক্ষণ কী?
জানা গিয়েছে, ইরানের শত্রু শিবিরের ডেরায় পড়েও মার্কিন সেনাবাহিনীর SERE প্রশিক্ষণের উপরে নির্ভর করেছিলেন ওই কর্নেল৷ মার্কিন বায়ুসেনায় যে প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক৷ SERE-র অর্থ সার্ভাইবাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স এবং এসকেপ৷ দেড় দিন ধরে এই SERE প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়েই নিজেকে ইরানের সেনার নজর থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন মার্কিন বায়ুসেনার ওই অফিসার৷
ওই উইপনস সিস্টেমস অফিসার যে পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, ঠিক সেই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য এই SERE প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়লেও শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করে অথবা তাদের নজর এড়িয়ে কীভাবে উদ্ধারকারী দলের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, SERE প্রশিক্ষণে পাইলটদের সেটাই শেখানো হয়৷ শুধুমাত্র অস্ত্র অথবা যন্ত্রের উপরে নির্ভর না করে কীভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বাঁচা সম্ভব, তার উপরেই এই প্রশিক্ষণে মূল জোর দেওয়া হয়৷
পাইলটরা বিমানের যে আসনে বসেন, তার নীচে এবং তাঁদের উর্দির ভিতরেই বিশেষ এক ধরনের গেঞ্জির মধ্যে অস্ত্র, যোগাযোগের জন্য রেডিও সেট, হেলমেটের মতো সরঞ্জাম থাকে৷ বিপদের মুহূর্তে পাইলটরা প্যারাশুটের সাহায্যে বিমান ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় এই সরঞ্জামগুলিও তাঁদের সঙ্গেই থাকে৷
তাদের পাল্টা দাবি, মার্কিন বায়ুসেনার কর্নেলকে উদ্ধারের চেষ্টা আমেরিকা শুরু করলেও সেই চেষ্টা ইরানের সেনা ব্যর্থ করে দিয়েছে৷ ইরান সেনার সেন্ট্রাল কম্যান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারির দাবি, দক্ষিণ ইসপাহানে একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দরে ওই পাইলটকে উদ্ধারের জন্য মার্কিন সেনা অভিযান শুরু করার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে৷ আমেরিকার দুটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত বিমান এবং দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও ধ্বংস করা হয়৷
ওই পাইলটকে উদ্ধার করা নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাকে ফাঁকা বুলি এবং নজর ঘোরানোর চেষ্টা বলেই পাল্টা কটাক্ষ করেছে ইরানের সেনাবাহিনী৷ তাদের পাল্টা দাবি, বাস্তবে যা ঘটছে তাতে ইরানের সামরিক ক্ষমতা যে অনেক বেশি তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে৷
