এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে বিষয়, তা হল হরমুজ প্রণালী,Strait of Hormuz৷ নজর কেড়েছে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিকতম বক্তব্যও৷ তিনি বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি যেসব দেশ ব্যবহার করে, তাদেরই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত; যুক্তরাষ্ট্রের এতে সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মূল দায়িত্ব অন্য দেশগুলোরই হওয়া উচিত।
advertisement
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পেছনে একটি অর্থনৈতিক কারণ লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে৷ সাম্প্রতিক কালে আমেরিকার জ্বালানি পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। শেল তেল উৎপাদনের বৃদ্ধির ফলে আমেরিকা এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর তাদের সরাসরি নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। এই কারণে অনেকেই মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নির্ভরশীল নয়।
তবে এই ধারণা আংশিক সত্য। কারণ, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি গভীরভাবে আন্তঃনির্ভরশীল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যয়ের চাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই সরাসরি নির্ভরতা কম থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে এই প্রণালীর স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
এছাড়া, পুরো প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতাই বেশি উদ্বেগের কারণ। সংঘাত চলতে থাকলে তেলের দামে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিমা খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে তেলের সরবরাহ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং বাজারে মূল্য অস্থিরতা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, চিন এবং জাপান৷ যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা দেখা দিলে এই দেশগুলি জ্বালানি সমস্যার মুখে পড়ে এবং তাদের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সামরিকভাবে জয়লাভ করা যতটা সহজ, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ততটা সহজ নয়। ইরান কৌশলগতভাবে এই অঞ্চলে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা সরাসরি যুদ্ধ না করেও ড্রোন, নৌ-মাইন বা সীমিত আক্রমণের মাধ্যমে প্রণালীকে অস্থির রাখতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের বক্তব্যে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে। তিনি একদিকে দাবি করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল নয়, অন্যদিকে বাস্তবতা হল—বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে এই প্রণালীর অস্থিরতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রও পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না। তাই হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক, এবং এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
