যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আমেরিকার এই আশায় জল ঢেলে গত ১২ দিন ধরে পাল্টা আমেরিকা এবং ইজরায়েলকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছে তেহরান৷ যার ফলে আরও তীব্র হয়েছে দু পক্ষের সংঘাত৷ ইরানের পাল্টা জবাবে অশান্ত হয়ে উঠেছে গোটা পশ্চিম এশিয়া৷ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, ওমানের মতো আমেরিকার সহযোগী দেশগুলিতেও আছড়ে পড়েছে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র এবং ড্রোন৷
advertisement
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে হিসেবনিকেশ করতেই ভুল হয়ে গিয়েছিল আমেরিকার৷ ইরানের প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা থেকে শুরু করে যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপরে কতটা পড়তে চলেছে, তাও আন্দাজ করতে পারেনি ওয়াশিংটন৷
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ইরানের হামলা চালানোর আগে আমেরিকার কোন কোন হিসেবে ভুল হয়েছিল-
১. ইরানের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা- নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার সবথেকে বড় ভুল ছিল ইরানের প্রত্যাঘাতের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা৷ আমেরিকা ভেবেছিল, হামলা হলে হয়তো কোনওমতে লড়বে ইরান৷ অথবা আত্মসমর্পণ করবে তারা৷ আমেরিকা এবং ইজরায়েলের শীর্ষ কর্তারা ভেবেছিলেন, দু দেশের যৌথ হামলায় হয়তো ইরানের কোমর ভেঙে যাবে৷ ফলে প্রত্যাঘাতের ক্ষমতাও থাকবে না তেহরানের৷ যদিও আমেরিকা এবং ইজরায়েলের হিসেবনিকেশকে উল্টে দিয়ে পাল্টা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সহযোগী দেশগুলিতে থাকা মার্কিন সেনা ঘাঁটি গুলিতে মিসাইল এবং ড্রোন হামলা শুরু করে তেহরান৷ ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নিজেদের সহযোগী সংগঠনগুলিকেও কাজে লাগায় তারা৷ ফলে ইরানের গণ্ডি পেরিয়ে এই যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে৷ ওয়াশিংটন ভাবতেও পারেনি, এই সামরিক সংঘাতকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ধরে নিয়ে এমন জোরাল জবাব দেবে ইরান৷
২. অপরিশোধিত তেলের বাজারে যুদ্ধের প্রভাব বুঝতেও ভুল- আমেরিকা ভেবেছিল, ইরানের উপরে হামলা হলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তার সাময়িক প্রভাব পড়বে৷ যুদ্ধ শুরুর আগেও মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের যুক্তি ছিল, ইরানের উপরে হামলা হলে অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েকদিনের জন্য অল্প বাড়লেও তার পর তা স্থিতিশীল হয়ে যাবে৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও বাস্তবে হয়েছে ঠিক উল্টোটা৷ যুদ্ধ তীব্র আকার নেওয়ায় জোগান বন্ধের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে৷ অপরিশোধিত তেলের দামের এই লাগামছাড়া বৃদ্ধিতে বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে৷ দাম বেড়েছে গ্যাসোলিনের৷ যার জেরে চাপে পড়েছে মার্কিন অর্থনীতিও৷ এই যুদ্ধই দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভিতও কীভাবে নড়ে যায়৷
৩. হরমুজ প্রণালীর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া- আমেরিকার আর একটি ভুল ছিল যুদ্ধের কতটা প্রভাব হরমুজ প্রণালীর উপরে পড়তে পারে, তা আন্দাজ করতে না পারা৷ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের জোগানের ২০ শতাংশই হয় হরমুজ প্রণালীর উপর দিয়ে৷ কিন্তু জাহাজে পণ্য পরিবহণের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটকে তারা নিশানা করবে বলে ইরান হুমকি দেওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলির চলাচল কার্যত থমকে গিয়েছে৷ ফলে বিশ্বের বহু দেশেই তেলের জোগানে টান পড়েছে৷ যার প্রভাব পড়েছে সেই দেশের বাজারগুলিতেও৷
৪. ইরানে ক্ষমতার হাতবদলের আশাতেও জল- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরাও ভেবেছিলেন, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের হামলায় খামেনেই সহ ইরানের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের মৃত্যুর পর হয়তো তেহরানে ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে৷ নয়তো এই সুযোগে ইরানের মানুষই দেশের সরকারের পতন ঘটাবে৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও ইরানের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে৷ খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ক্ষমতার হাতবদল দূরে থাক, বরং দেশের ভিতরে জাতীয়তাবাদের হাওয়া আরও জোরাল ভাবে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছে ইরানের নেতৃত্ব৷
৫. পালানোর পথ নেই- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু করে দিলেও কীভাবে তা শেষ করতে হবে সেই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আমেরিকা এবং ইজরায়েলের৷ ইরানের জোরাল জবাবে দুই দেশের হিসেবনিকেশ আরও গুলিয়ে গিয়েছে৷ তার উপর প্রথমে ইরানে নিয়ন্ত্রিত হামলার কথা বলেছিল আমেরিকা এবং ইজরায়েল৷ পরে মুখরক্ষায় ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শর্ত দিতে শুরু করে তারা, যার ফলে সংঘাত আরও তীব্র আকার নেয়৷ ইরানে হামলা চালানোর মূল লক্ষ্য কী, তা নিয়েও সম্ভবত বিভ্রান্ত ছিল ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভ৷ ফলে কোথায় তারা থামবে, সেই সিদ্ধান্তও আগে থেকে নেওয়া ছিল না৷ সূত্রের খবর, হোয়াইট হাউসের অন্দরেও মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের একাংশ বার বার যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করার পক্ষেই সওয়াল করেছে৷
