রাজীব কাপুর ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁর অভিনয় জীবনে প্রায় ১৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন, কিন্তু কোনওটিই তাঁর বাবা রাজ কাপুর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্রটির মতো আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি ‘এক জান হ্যায় হাম’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু দর্শক দরবারে সুপরিচিত হওয়ার জন্য তাঁকে বাবা রাজ কাপুর পরিচালিত ১৯৮৫ সালের রাম তেরি গঙ্গা ময়লি চলচ্চিত্রটির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই অপেক্ষা ছিল বক্স অফিস সাফল্যের জন্যও, কারণ তাঁর কর্মজীবনের অন্য কোনও ছবি এতখানি সাড়া জাগাতে পারেনি।
advertisement
আরও পড়ুন- বিশ্বের একমাত্র দেশ, যা খায় শুধু সেটুকুই উৎপাদন করে, বাইরে থেকে কিছু আমদানি করে না !
নায়িকা মন্দাকিনীকে নিয়ে রাজ কাপুর একটি সুপারহিট চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ছিল সেই বছরের সর্বোচ্চ আয়ের হিন্দি চলচ্চিত্র। এটি মুম্বইতে ডায়মন্ড জুবিলি এবং অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতে গোল্ডেন জুবিলি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি ১৯৮০-এর দশকের সর্বোচ্চ আয়ের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, ‘ক্রান্তি’ (১৯৮১) এবং ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ (১৯৮৯)-এর পাশাপাশি সিনেমা হলে রমরমিয়ে চলেছিল।
রাজীব এই চলচ্চিত্রে নরেন্দ্র সহায় নামের চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি কলকাতার একজন ধনী পরিবারের উত্তরাধিকারী, তিনি গঙ্গা নামের এক পাহাড়ি মেয়ের প্রেমে পড়েন। তাঁদের বিয়ে হয়, কিন্তু নরেন্দ্রকে শীঘ্রই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যেতে হয়। চলচ্চিত্রটি মূলত গঙ্গার তার শিশু পুত্রকে নিয়ে স্বামীর খোঁজে যাত্রার উপর আলোকপাত করে এবং কীভাবে পথের প্রতিটি ধাপে সে শোষিত ও নির্যাতিত হয়, তা তুলে ধরে।
সে একটি পতিতালয়ে আশ্রয় নেয় এবং অবশেষে নরেন্দ্রের পরিবারের আয়োজিত একটি বিয়েতে নাচ পরিবেশনের জন্য তাকে ডাকা হয়, যেখানে তাদের আবার দেখা হয়। নরেন্দ্র তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং গঙ্গাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে চায়, কিন্তু গঙ্গা ততদিনে কলুষিত হয়ে গিয়েছে এবং সমাজ তাকে গ্রহণ করতে চায় না। এরপর নরেন্দ্র গঙ্গা ও তার সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
আরও পড়ুন– নিজের অহঙ্কারের শিকার ! একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোডাকের কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য গ্রাস করে
রাজ কাপুর এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, বৈষম্য এবং শ্রেণি বিভাজন তুলে ধরেছেন। সেই সময়ে চলচ্চিত্রটি অনেক দিক থেকেই যুগান্তকারী ছিল, বিশেষ করে চলচ্চিত্র নির্মাতার স্তন্যপান করানোর দৃশ্যের ব্যবহার এবং সমাজের ভণ্ডামির নৃশংস উন্মোচন উল্লেখযোগ্য। মন্দাকিনীর ঝর্ণার নীচে স্নানের মতো সাহসী দৃশ্যগুলো সমালোচনার জন্ম দিলেও রাজ কাপুর নায়িকার এ হেন চিত্রণকে রুচিসম্মত বলেই মত দিয়েছিলেন।
মন্দাকিনীর চরিত্র গঙ্গার প্রতীক, পাহাড়ের এক নিষ্পাপ মেয়ে দূষিত সমভূমিতে নেমে আসে এবং মানব সমাজের অপবিত্রতায় কলঙ্কিত হয়। আমেরিকান ভারততত্ত্ববিদ ফিলিপ লুটগেনডর্ফ এই চলচ্চিত্রটিকে একটি রূপক হিসেবে অভিহিত করেছেন যা “ধ্রুপদী ও পৌরাণিক আখ্যান, এবং মৃদু রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষ্যকে সংশ্লেষিত করে”। তিনি এই আখ্যানটিকে অভিজ্ঞানশকুন্তলমের গল্পের সঙ্গেও তুলনা করেছেন, যা প্রথমে মহাভারতে প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরে কবি কালিদাস এটিকে নতুন করে রচনা করেছিলেন।
রবীন্দ্র জৈন সুরারোপিত ‘রাম তেরি গঙ্গা ময়লি’-র সঙ্গীত এর বক্স অফিস সাফল্যে অপরিমেয় অবদান রেখেছিল। ‘এক রাধা এক মীরা’, ‘সুন সাহিবা সুন’ এবং টাইটেল ট্র্যাকের মতো গানগুলো আজও জনপ্রিয়।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও এটি রাজীব কাপুরের কর্মজীবনের একমাত্র সফল প্রজেক্ট হয়ে আছে। ছবির পরিচালক এতটাই বড় একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে তাঁকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, উপরন্তু ছবিটি নারীপ্রধান চরিত্রের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল, যা মন্দাকিনীকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছিল, কিন্তু রাজীবের কেরিয়ারের জন্য তেমন কোনও সহায়তা এনে দেয়নি।
তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্র, যেমন ‘লাভার বয়’ (১৯৮৫), ‘অঙ্গারে’ (১৯৮৬), ‘হাম তো চলে পরদেশ’ (১৯৮৮) এবং ‘জলজলা’ (১৯৮৮) রাম তেরি গঙ্গা ময়লি-র সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি। রাজীব ১৯৯০ সালে ‘জিম্মেদার’ ছবিতে শেষবারের মতো অভিনয় করেন, এর পর তিনি প্রযোজনা ও পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন।
