বিরক্তিকর অন্ধকারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমরা। ‘আমরা’ মানে সত্তরের দশক, ‘আমরা’ মানে আমাদের বেকারত্ব-হতাশা-গ্লানি। যারা স্বপ্ন দেখেছিল বদলে দেবে পৃথিবীটাকে, তাদের স্বপ্ন দেখার মহড়ায় বাধা দিয়েছিল পেটের দায়, খিদের টান। একটা মাথা আলো-বাতাসহীন- নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছিটকে পড়ছে কান্না, গতিক সুবিধের নয়। মেয়ে থেকে অচিরেই কেউ হয়ে যাচ্ছে ‘নষ্ট মেয়ে’। চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে ‘নটবর দত্ত’। কলার খোসায় পা পিছলোচ্ছে তাদেরও। রাস্তায় হোঁচট খাওয়া ‘সোমনাথ’ হয়ে উঠছি আমরাও। আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদেরই আগামী দশক, ছাত্র-আন্দোলনের স্মৃতিকে ধাক্কা দেওয়া সেইসব দেওয়াল-লিখন, যা থেকে যে কোনও মুহূর্তেই বিস্ফোরণ হতে পারত। আমাদের উচ্চাশাতাড়িত প্রেমিকারা নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। আমাদের গিলে খাচ্ছে স্ববিরোধ। আমাদের কানেও বাজতে থাকছে বিসদৃশ এক বাজনা। আমরা গিলে খেলাম সত্যজিৎ, প্রচারবিমুখ রয়ে গেলেন শংকর। বিদায় নিলেন জনঅরণ্য থেকে।
advertisement
কিছুটা অভিমান কি ছিল? না! বরং ‘তিনি’ই বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।” হয়তো তাই। সত্যিই কি সত্তরের দশকের উত্তাল কলকাতা বইয়ের পাতা থেকে সেলুলয়েডে এসে না পড়লে কি ‘শংকর’ নামটাও থেকে যেত ‘কত অজানার’ দলে? কলকাতার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের কাকে মনে পড়ে? স্যাটা বোসকে নাকি উত্তম কুমারকে? সত্যজিৎকে নাকি ‘শংকর’কে?
১৯৩৩ সালে বনগাঁয় জন্ম তাঁর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কে তাঁর পরিবার যখন ফিরে গেল বনগাঁয় শংকর থেকে গেলেন বাবার সঙ্গে। তারপর পরপর অঘটন, পিতৃবিয়োগ। জীবিকার প্রয়োজনে কখনও শুধু কেরানি তার কিছুদিন পরেই কাজ নিয়েছিলেন ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই আশ্রয় করে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। সাহিত্যের জগতে সেটাই ‘নায়কের প্রবেশ’ আর আজ তাঁর ‘প্রস্থান’। কলকাতার হোটেলের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যেত যে আশা-ব্যর্থতার সংলাপ, যে সাফল্য-ব্যর্থতা, যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা সব তিনি তুলে ধরেছিলেন বইয়ের পাতায়। তবু স্বীকৃতি মিলল কই? বরং দিনের পর দিন তাঁর পরিচয় হয়ে রইল শুধু ‘চৌরঙ্গী’র লেখক! ‘শুধু কেরানি’ একটা লোকের কলমে ফাইভ স্টার হোটেলের গল্প? তা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কম হয়নি। তিনি অভিমান করেছেন। শুটিং দেখতে যাননি। তবে উত্তম কুমারের পাশে বসে সিনেমা দেখেছেন। যাতায়াত করেছেন একে অপরের বাড়িতে। তারপর ‘সীমাবদ্ধ’,‘জন অরণ্য’। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। যা হয়তো পাওয়া উচিত ছিল অনেক আগে। লকডাউনের সময়েও তাঁর কলম থামেনি। লিখেছেন ‘দুঃসময়ের দিনলিপি’।
প্রয়াত শংকর৷ বাংলার কালজয়ী সাহিত্যিকের মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯২ বছর৷ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন৷
গত ৪ ফেব্রুয়ারি বার্ধক্য জনিত সমস্যা এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান সাহিত্যিক৷ আইসিসিইউ-তে চিকিৎসাধীন ছিলেন শংকর৷ আজ, শুক্রবার দুপুর ১২:৪৫ মিনিটে চলে গেলেন ‘জীবনের পাশ থেকে…’
‘আকাশে বিয়োগগাথা
নতুন ব্যথার মতো
তারা ফুটে উঠছে একটা দুটো
তুমি তো দেখেছ মৃত্যু, দেখেছ অনেক শীতরাত…’
