উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুরের ৮ নম্বর রেলগেটের কাছে একটি আবাসনে থাকেন। সেখানেই প্রায় ২০০০ স্কোয়্যারফুট জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালে মাত্র দুটি হোম ডেলিভারির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল উপমার ব্যবসায়িক পথচলা। গ্রাহকদের ভাল সাড়া পেতে শুরু করলে, অর্ডারের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তখন উপমাকে নিজে হাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রুটি তৈরি করতে হত, যা ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। সেই সময় তাঁর মাথায় আসে রুটি তৈরির মেশিন ব্যবহারের ভাবনা।
advertisement
আরও পড়ুনঃ বিকেল গড়ালেই বদলাবে আবহাওয়া! কালবৈশাখীর দাপটে তছনছ? ঝেঁপে বৃষ্টির সম্ভাবনা কোন কোন জেলায়? জানুন
এরপর খোঁজ শুরু করে ভিনরাজ্য থেকে একটি মেশিন এনে ২০২৩ সালে যান্ত্রিকভাবে রুটি তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে শুধু মেশিন ব্যবহারই নয়, কীভাবে নিজস্বভাবে রুটি তৈরির মেশিন তৈরি করা যায় এবং সেই মেশিনের সার্ভিস দেওয়া যায়, সেই পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে কাজ শুরু করেন উপমা। পরিশ্রম ও উদ্যোগের জোরে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ৩০টিরও বেশি রুটি তৈরির মেশিন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু হয়েছে তাঁর উদ্যোগে।
রাজ্যের বাইরে ত্রিপুরা ও অসমেও চলছে এই পরিষেবা। সব মেশিনের সার্ভিস এখনও পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেই দেওয়া হয়। সোদপুরের মূল শাখায় বর্তমানে প্রায় ২০ জন মহিলা কাজ করছেন, পাশাপাশি কয়েকজন পুরুষ কর্মীও রয়েছেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মহিলা রুটি তৈরি ও ফ্রোজেন রুটি-লুচি বিক্রি করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। তাঁদের পাশে সবসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন উপমা ও তাঁর টিম। শুধু রুটি নয়, একই মেশিনে এখন ফ্রোজেন লুচি, কচুরি ও পরোটা তৈরি করা হচ্ছে। কেউ যদি তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্রোজেন রুটি, লুচি বা অন্যান্য পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে চান, তাঁদের সাহায্য করার জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সেই ভাবনা থেকেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের ট্যাগলাইন ‘বেলার কষ্ট নেই, সময় নষ্ট নেই।’
এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ মহিলা ব্যারাকপুর, নৈহাটি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের কথায়, এখানে কাজ করতে গিয়ে কখনও মনে হয় না যে তাঁরা চাকরি করছেন, বরং ঘরোয়া পরিবেশেই স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারেন। একই সঙ্গে মাসের শেষে আয়ও হচ্ছে বেশ ভালই। ছোটবেলা থেকেই কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন উপমা। নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছাই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তাঁর মতে, বাঙালিরা ব্যবসা করতে পারে না, এই ধারণা তিনি মানেন না। বরং তিনি বলেন, বাণিজ্যের ঐতিহ্য বাঙালিরই। তাই বাঙালিদেরই আবার সেই পথে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁর কথায়, বানিজ্যে বসতে লক্ষ্মী।
উপমা জানান, তিনি কোনওদিন ‘সিইও’ হতে চান না, বরং নিজের কর্মশালায় কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে এভাবেই থাকতে চান। আজও তিনি নিজে হাতে আটা-ময়দা মাখা থেকে শুরু করে লেচি কাটা পর্যন্ত কাজ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মহিলাদের ন্যূনতম বেতন ৬ হাজার টাকা, পাশাপাশি রয়েছে প্রতিদিনের ওভারটাইমের সুযোগ। ভবিষ্যতে কর্মীদের জন্য পিএফ ও ইএসআই চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রায় ৫০০ জন মানুষ যুক্ত বলে দাবি উপমার। তাঁদের পরিবারকেও তিনি নিজের পরিবারের অংশ বলেই মনে করেন।
প্রথম মেশিন নিয়ে যে সমস্যার মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এখন নতুন মেশিন নেওয়া প্রত্যেককে যথাযথ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। উপমার বার্তা, নিজের পরিচয় তৈরি করুন, নিজের মতো করে বাঁচুন এবং লড়াই ছাড়বেন না। তাঁর বিশ্বাস, লড়াই চালিয়ে গেলে সাফল্য একদিন আসবেই। এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়েই তিনি যেন বহু নারীর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।





