প্রতিবার GPS খুললেই ব্যবহার করছেন ২,০০০ বছরের পুরনো এক 'পদ্ধতি'! জানেন সেটা কী?
- Published by:Tias Banerjee
Last Updated:
স্মার্টফোনে জিপিএস খুলে পথ খোঁজা বা আবহাওয়ার খবর জানা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির এই সুবিধার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো এক বৈজ্ঞানিক ধারণা। উপগ্রহ বা উন্নত যন্ত্র ছাড়াই যে মানুষটি প্রথম যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীকে মাপার সাহস দেখিয়েছিলেন, তাঁর চিন্তাভাবনাই আজকের ভূগোল ও মানচিত্রবিদ্যার ভিত্তি। সেই প্রাচীন জ্ঞান আর আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগের গল্পই এই প্রতিবেদনের বিষয়।
advertisement
advertisement
advertisement
খ্রিস্টপূর্ব ২৭৬ থেকে ১৯৪ সালের মধ্যে বসবাসকারী এরাটোস্থেনিসকেই ‘ভূগোলের জনক’ বলা হয়। তিনিই প্রথম ‘Geography’ বা ভূগোল শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুক্তি ও সংখ্যার সাহায্যে পৃথিবীর মাপ নেওয়া ও মানচিত্র আঁকা সম্ভব। সে সময়ে যখন বহু মানুষ কাহিনি ও কল্পনার উপর নির্ভর করতেন, তখন তিনি বিজ্ঞানের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর কাজই ভূগোলকে অনুমানের বিষয় থেকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
advertisement
এরাটোস্থেনিস কেবল ভূগোলবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, কবি এবং সঙ্গীত বিশেষজ্ঞও। বর্তমান লিবিয়ার সাইরিন শহরে তাঁর জন্ম। নানা বিষয়ে জ্ঞান থাকার কারণেই তিনি বিভিন্ন ধারণাকে একসূত্রে গেঁথে দেখতে পেরেছিলেন। বাস্তব পৃথিবীকে বোঝানোর জন্য শিক্ষার প্রয়োজন—এই ধারণাই তাঁকে সমসাময়িক বহু পণ্ডিতের থেকে আলাদা করেছিল।
advertisement
তাঁর অসাধারণ মেধার জন্যই তিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গ্রেট লাইব্রেরির প্রধান গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন। সেই গ্রন্থাগার ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র। নানা অঞ্চল থেকে পণ্ডিতেরা সেখানে আসতেন। তাঁকে ‘বেটা’ বলা হত, যার অর্থ সব বিষয়ে দ্বিতীয় সেরা—এটি আসলে প্রশংসাসূচক উপাধি, যা তাঁর বহুমুখী দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
advertisement
advertisement
এরাটোস্থেনিস প্রথম দিকের একটি বিশ্বমানচিত্র তৈরি করেন, যেখানে তিনি গ্রিড পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। মানচিত্রে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি রেখা টেনে স্থান নির্ধারণের চেষ্টা করেন, যা পরবর্তীতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হিসেবে পরিচিত হয়। এই ধারণাই আজ দূরত্ব মাপা ও অবস্থান নির্ণয়ের ভিত্তি। তিনি পৃথিবীকে পাঁচটি জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন—মেরুর কাছাকাছি শীতল অঞ্চল, মাঝখানে উষ্ণ অঞ্চল এবং তার মাঝামাঝি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল। এই শ্রেণিবিভাগ আজও ব্যবহৃত হয়।
advertisement
তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, সায়েনে দুপুরবেলায় সূর্যের আলোয় কোনও ছায়া পড়ে না, কিন্তু একই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় একটি দণ্ডের ছায়া পড়ে। এই দুই শহরের দূরত্ব ও ছায়ার কোণ ব্যবহার করে তিনি পৃথিবীর সম্পূর্ণ পরিধি হিসাব করেন। আধুনিক মাপের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তাঁর হিসাব আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি ছিল। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, গণিতের সাহায্যে পৃথিবীর মাপ নেওয়া সম্ভব।
advertisement
এরাটোস্থেনিসের আগে ভূগোল অনেকটাই কাহিনি ও দর্শনের সঙ্গে মিশে ছিল। তিনি পর্যবেক্ষণ, সংখ্যা ও যুক্তির মাধ্যমে এই বিদ্যাকে বিজ্ঞানসম্মত করেন। তাঁর লেখা ‘জিওগ্রাফিকা’ গ্রন্থে তিনি পরিচিত বিশ্বের বর্ণনা দেন এবং ৪০০-র বেশি শহরের তালিকা করেন। এই কাজ ভূগোলকে ইতিহাস ও দর্শন থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
advertisement
advertisement
দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এরাটোস্থেনিসের কাজ আজও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। প্রতিটি ডিজিটাল মানচিত্র, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কিংবা যাত্রাপথ নির্ধারণে তাঁর ধারণাগুলিই ব্যবহৃত হয়। কৌতূহল ও যুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে বোঝার যে পথ তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটাই তাঁকে প্রকৃত অর্থে ‘ভূগোলের জনক’ করে তুলেছে।






