corona virus btn
corona virus btn
Loading

বাংলা ভালবাসি, কিস্তি ১:অন্ধকার থাকতে থাকতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন ব্রজবাসী! খুঁজে বের করতে চাইছিলেন সীমান্তের ওপারের দেশটাকে...

বাংলা ভালবাসি, কিস্তি ১:অন্ধকার থাকতে থাকতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন ব্রজবাসী! খুঁজে বের করতে চাইছিলেন সীমান্তের ওপারের দেশটাকে...
photo source collected
  • Share this:

দেশভাগের আঁচটা আগেই পেয়েছিলেন ব্রজবাসী! অন্ধকার থাকতে থাকতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। খুঁজে বের করতে চাইছিলেন সীমান্তের ওপারের দেশটাকে। রাস্তায় বেরিয়ে দেখলেন তিনি শুধু একা নয়। আরও অনেক মানুষ বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছেন বর্ডারের দিকে। তাঁদের সঙ্গে পা মেলালেন ব্রজবাসীও। বেলা বাড়তেই মাথার উপর সূর্য উঠে গিয়েছে। রোদে ঝলসে যাচ্ছে গা। তবুও হাঁটা না থামিয়ে সোজা পার করে ফেললেন বর্ডার। এলেন কোচবিহারে। কোচবিহারে তখনও রাজার শাসন। কোচরাজার হাত থেকে তখনও শাসন ক্ষমতা ভারত সরকারের কাছে আসেনি। তার কদিন বাদেই স্বাধীন হল বাংলাদেশ। কিন্তু ব্রজবাসী ওপার বাংলা থেকে আসা উদবাস্তু ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁর কোনও দেশ নেই। তোর্সা নদীর ধারে একটা ছোট্ট মাটির ঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করে সে। জানে না কি করবে? কি খাবে? এরই মধ্যে ওপার বাংলা থেকে লুটপাট, দাঙ্গা সহ্য না করতে পেরে তাঁর আত্মীয়রাও চলে এসে জুটলো ব্রজর সঙ্গে। মাঝ বয়সে আবার নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করলেন ব্রজ। সেই শুরু। দলে দলে ওপার বাংলার টাঙ্গাইল, ময়মনসিং, বিক্রমপুর, পাবনা, নোয়াখালি, সিলেট থেকে লোক আসতে শুরু করে এপারে। এপারের ঘুঘুমারি, পুষনাডাঙা, খেসিরঘাট, রসের হাট, গাজলের কুঠিতে তাদের অনেকেই থাকা শুরু করল।কিছুদিনের মধ্যেই জমে উঠল বসতি। ছাদ তো পাওয়া গেল। কিন্তু খাবেন কী? কোদাল চালিয়ে চাষবাস তেমন কেউ জানেন না। তাহলে উপায়! ব্রজবাসীই বুদ্ধি দিলেন। শুরু করলেন বেতের চাষ। বেত বুনে বানিয়ে ফেললেন শীতলপাটি। এই পাটি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। শুধু গরমকালে আরাম দেওয়াই কাজ নয় এই পাটির। এয়ারকন্ডিশনার ঘরেও শীতল পার্টি দেখা যায়। ঘর সাজানোর কাজেও লাগছে এই পার্টি। তবে আমাদের রাজ্যেই কেবল নেই এই পাটির্র চাহিদা। কিন্তু রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশে প্রায় নিয়মিত পাঠানো হয়। এছাড়াও পাঠানো হচ্ছে তাইওয়ান , কুয়েতেও। ইউরোপেও পাড়ি দিচ্ছে বাংলার শীতলপাটি।

তবে এতো ভাল খবর। এই ফুরফুরে বাতাসের পিছনেই আছে ঘন কালো অন্ধকার। ব্রজবাসী যেখানে এসে বসতি তৈরি করেছিল সেই ব্লকেই এখন ত্রিশ হাজার পাটি শিল্পী থাকেন। এছাড়াও কোচবিহারের অনত্র ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে রয়েছে আরও হাজার পাঁচেক শিল্পী। সকাল হতেই সবাই নেমে পড়ে পাটি বুনতে। ছেলে, বউ এমনকি বাচ্চারাও এই কাজ করে। অনেকে এই কাজ করেই জোগাড় করে পড়াশুনার টাকা। তেমন রোজগার নেই। তবুও তারা আকড়ে ধরে রেখেছেন এই শিল্পকে। চাইলেই অন্য কাজ খুঁজে নিতে পারেন তাঁরা। কিন্তু তাহলে যে শিল্পটা মরে যাবে! দেশভাগের আগে ওপার বাংলার 'চিকনাই পাটি', 'কাবজোরা', 'লালপাটি শিরজোরা' এগুলো কিছুই এখানে হয় না। শুধু মাত্র সিরাজগঞ্জের শীতলপাটিই হয় এখানে। কিন্তু এই শিল্প এখন ধুঁকছে। যদিও অনেক সেচ্ছাসেবী সংস্থা এগিয়ে এসেছে তাদের উন্নতির জন্য। এখানকার ধলুয়াবাড়ির পাটিশিল্পী তাঁর কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছেন। পুরস্কৃত হয়েছেন নারায়ণ চন্দ্র দাসও। তৈরি হচ্ছে ব্যাগ, জুতো, মোবাইল রাখার ব্যাগও। তবে সব কিছুরই বাংলার বাজারে চাহিদা খুব কম। এখানে দু ধরণের শিল্পী রবেছেন। এক দল নিজেরাই জমিতে বেত চাষ করে পাটি বোনে। আর এক দল অন্যের থেকে বেত কিনে পাটি বোনেন। এছাড়াও কিছু শিল্পী আছেন যারা অন্যের হয়ে কাজ করে দেন বদলে দিন প্রত্যেক পাটি পিছু পান ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। সপ্তাহে চারটের বেশি পাটি এক জন বুনে উঠতে পারে না। ফলে রোজগার হব খুবি কম। ঘুঘুমারির গোপালচন্দ্র দে জানালেন," আমার বেত চাষের জমি নেই। তাই একটা পাটির জন্য ১৫০ টাকার বেত কিনে ১০ টাকা ভ্যান ভাড়া দিয়ে নিয়ে আসতে হয়। এই বেত ক্ষেত থেকে তোলার টাকাও আমাকেই দিতে হয়। সেটাও ওই ১৫০ টাকা। এবার একটা পাটি বুনতে দিতে হয় ১৫০ টাকা। তাহলে খরচা হয়ে গেল ৪৬০ টাকা। এই পাটিটা এবার পাইকারি দরে ৫০০ টাকায় বিক্রি হবে লাভ বলতে ওই ৪০ টাকা। তবুও এই শিল্পকে আমরা ছাড়তে পারব না। কারণ আমরা এছাড়া আর কিছু জানি না।' আর এক শিল্পী ফণিভূষণবাবু বললেন," দেখুন আজকাল আমাদের নতুন প্রজন্ম আর চাইছে না এই শিল্পকে টেনে নিয়ে যেতে। তারা এতে কোনও আয়ের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। তাই তারা সবাই বাইরে কাজ করতে চলে যাচ্ছে। তখন বাধ্য হয়েই পরিবারের বাইরের লোককে টাকা দিয়ে এই কাজ করাতে হচ্ছে। তারপর আবার বেত চাষের উপর রয়েছে চা চাষের মতোই বিঘা পিছু কর ব্যবস্থা। মার্চ এপ্রিল মাস থেকেই বাজারে শীতলপাটি আসতে শুরু করবে। এই সময় যারা আগে থেকে কিনে বাড়িতে পাটি মজুত রাখেন আসল লাভটা তাদেরই হয়। শিল্পীরা এই টাকা চোখেও দেখতে পান না। তবে এখন বাইরে যাচ্ছে বলে চাহিদা অনেকটা বেড়েছে আগের থেকে। গ্রামের এক শিল্পী সরলা দেবী জানতে চাইলেন," আমরা ব্রজবাসীর দেখানো পথেই হাঁটতে শুরু করেছিলাম। আগে তো গরম পড়তে না পড়তেই লোকে শীতলপাটি কিনত। কিন্তু আজকাল সবার ঘরে ঠাণ্ডা মেশিন আছে। তাই আর এই পাটি কারও কাজে লাগে না। বলতে পারেন এই ঠাণ্ডা মেশিন আমাদের দেশে আনল কে? আমরা তো ভাতে মরে যাব!" না এর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তার কারণ এর কোনও উত্তর হয় না। তবে ওপার বাংলার ব্রজবাসীর স্বপ্ন কিছুটা হলেও সত্যি হয়েছে। ব্রজ না এলে শীতলপাটি বস্তুটাই এপারে আসত না। এই দুই বাংলার ভাগ হয়ে আর কিছু হোক না হোক শীতলপাটি শিল্পটা এ দেশের হয়েছে। তবে এই শিল্প নিয়ে রাজ্য সরকার ভাবা শুরু করে দিয়েছেন। পাটি শিল্পীদের বিভিন্ন মেলায় এসে পাটি বিক্রির সুবিধা করে দিয়েছেন। তাদেরকে ওবিসি শিল্পীর আওতায় এনে টাকা পয়সা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ শিল্পীই জানেন না কী করে পেতে হবে এই সুবিধে।

First published: March 7, 2019, 9:03 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर