বিশেষ শর্তে সম্মতির পরেই বিয়েতে রাজি, প্রকৃতিই ছিল আরণ্যক সুন্দরলাল বহুগুণার ধাত্রীদেবতা

সুন্দরলাল বহুগুণা, ১৯২৭-২০২১

শুধু পর্বত নয়, হিমালয় ছিল তাঁর হৃদয় ৷ অহরহ রক্তপাত হত সেখানে, যখন দেখতেন প্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বস্ত করে চলছে নাগরিক উন্নয়ন ৷ হিমালয় এবং তাঁর বাসিন্দারা ছিলেন বহুগুণার পরমাত্মীয় ৷ তাঁদের সার্বিক কল্যাণে ব্রতী ছিলেন আজীবন ৷

  • Share this:
    আজীবন গ্রামে থাকবেন ৷ সেখানেই আশ্রম খুলবেন দরিদ্র গ্রামবাসীদের জন্য ৷ এই শর্ত দিয়েছিলেন হবু স্ত্রীকে ৷ তাতেই রাজি হয়েছিলেন বিমলা ৷ বরমাল্যে বরণ করে নিয়েছিলেন তাঁকে, যাঁর নামের মতো কাজেও বিরাজ করে সবুজের সৌন্দর্য ৷ সবুজের সাধক তিনি আজন্ম ৷ উত্তরাখণ্ডের তেহরিতে ১৯২৭ সালের ৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা সুন্দরলাল বহুগুণা আকৈশোর গান্ধীবাদের ভক্ত ৷ মহাত্মার জীবনদর্শনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা শ্রী দেব সুমন ৷ তখন থেকেই অহিংস নীতিকে জীবনের মন্ত্রগুপ্তি বলে গ্রহণ করেছিলেন বহুগুণা ৷ সদ্য তারুণ্যে পা রেখেই সোচ্চার হয়েছিলেন অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ৷ মহাত্মার আদর্শকে ধ্রুবতারা করে যুবক বয়সেই বেরিয়ে পড়েছিলেন গহিন হিমালয়ের কোলে ৷ পর্বত এবং পার্বত্য সরলবর্গীয় অরণ্যে চলেছিল তাঁর পরিব্রাজন ৷ শুধু পর্বত নয়, হিমালয় ছিল তাঁর হৃদয় ৷ অহরহ রক্তপাত হত সেখানে, যখন দেখতেন প্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বস্ত করে চলছে নাগরিক উন্নয়ন ৷ হিমালয় এবং তাঁর বাসিন্দারা ছিলেন বহুগুণার পরমাত্মীয় ৷ তাঁদের সার্বিক কল্যাণে ব্রতী ছিলেন আজীবন ৷ জনকল্যাণের মধ্যে তাঁর কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মহিলাদের অবস্থান ৷ তাঁর নেতৃত্ব এবং দেখানো পথেই পাহাড়ি মহিলারা প্রতিবাদী হয়েছিলেন মদ্যপানের নেশার বিরুদ্ধে ৷ স্বাধীনতার আগে কংগ্রেসের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছিল বহুগুণার ৷ পরে তাঁর আন্দোলনের ভরকেন্দ্র সরে এসেছিল সামাজিক সমস্যায়, যার অনেকটাই জড়িয়ে ছিল প্রকৃতির ভালমন্দের সঙ্গে ৷ প্রকৃতির প্রতি নিখাদ ভালবাসা ও যত্ন থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘চিপকো’ আন্দোলনের সমার্থক ৷ আন্দোলন কীভাবে করবেন, তার প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন স্ত্রী, বিমলা৷ সে সময়ের উত্তরপ্রদেশের, এখন উত্তরাখণ্ডে হিমালয়ের কোল জুড়ে বিস্তৃত অরণ্যকে ঠিকাদারদের বৈদ্যুতিন করাতের কোপ থেকে বাঁচাতে জীবনপণ করেছিলেন বহুগুণা ৷ তাঁর কথায় হাতে হাত ধরে গাছেদের আগলে রেখেছিলেন স্থানীয় মহিলা ও শিশুরা ৷ গাছের প্রাণ নিতে হলে আগে তাঁদের হত্যা করতে হবে ৷ সবুজের সঙ্গে লেগে থেকে বা চিপকে থাকার ‘চিপকো’ আন্দোলনের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী ৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বহুগুণার বৈঠকের পরে স্থগিতাদেশ জারি হয় গাছ কাটার উপর ৷ এই জয়লাভকে গ্রামবাসীদের সম্মিলিত প্রয়াস বলে চিহ্নিত করেছিলেন বহুগুণা ৷ আজীবন তাঁর মতবাদ ছিল, ‘বাস্তুতন্ত্রই অর্থনীতি’৷

    চিপকো আন্দোলন, ফাইল চিত্র

    চিপকো-র মতো একই উদ্যমে বহুগুণা সামিল হয়েছিলেন তেহরি বাঁধ আটকানোর আন্দোলনে ৷ সাবেক উত্তরপ্রদেশের (এখন উত্তরাখণ্ডে) তেহরিতে ভাগীরথীর উপর বাঁধ নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন বহুগুণা ৷ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের দেখানো পথে তিনি ভাগীরথীর তীরে একাধিক অনশন কর্মসূচি পালন করেছিলেন ৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও-এর কাছ থেকে রিভিউ কমিটি তৈরির আশ্বাস পেয়ে ১৯৯৫ সালে দেড় মাসের অনশন আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান বহুগুণা ৷ পরে দেবগৌড়ার আমলে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে তিনি ৭৪ দিন ধরে অনশন কর্মসূচি পালন করেছিলেন ৷ এর পর সুপ্রিম কোর্টে এক দশকেরও বেশি আইনি লড়াই চলার পরেও বাঁধনির্মাণ শুরু হয় ২০০১ সালে ৷ সে বছর ২৪ এপ্রিল গ্রেফতার হন পরিবেশবিদ বহুগুণা ৷ নিজের জন্মস্থানে নদীর গতিরুদ্ধ আটকাতে না পেরে বহুগুণা তেহরি ছেড়েই চলে যান ৷ প্রথমে কোটি এবং তার পর দেহরাদুনের থাকতেন তিনি ৷ তার বহু আগেই তেহরি বাঁধ প্রকল্পের পরিকল্পনা বন্ধ না করায় ১৯৮১ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করতে নারাজ হন তিনি ৷ ২৮ বছর পর পদ্মবিভূষণ অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেননি প্রবীণ এই পরিবেশবিদ ৷ যে পরিবেশকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালবাসতেন তিনি, তার সঙ্গেই বিলীন হয়ে গেলেন গত ২১ মে ৷ রেখে গেলেন পরিবার, অসংখ্য গুণমুগ্ধ এবং হিমালয়ের সুবজকে ৷ কোভিডের অতিমারি তাঁকে অধরা করল শুধু চোখেই ৷ আসলে হিমালয়ের প্রতিটি কণায় রয়ে গেলেন তাদের পালকপিতা, আরণ্যক সুন্দরলাল বহুগুণা ৷ প্রকৃতি যেমন তাঁর ধাত্রীদেবতা ছিলেন, তিনিও ছিলেন প্রকৃতির লালনকারী ৷
    Published by:Arpita Roy Chowdhury
    First published: