তাঁকে বাংলার রাজনীতির চাণক্য বলা হত। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য৷ এক সময়ে তিনিই ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড। তারপর একে একে রাজ্যসভার সাংসদ, দেশের রেলমন্ত্রী ও জাহাজমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন৷
তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক অধ্যায়ে তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরই তাঁর কথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তৃণমূলের সংগঠন তৈরি থেকে শুরু করে জমি আন্দোলন, পরিবর্তনের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৈনিক ছিলেন মুকুল রায়। ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী। মুখ্যমন্ত্রী ভাইফোঁটাও দিতেন তাঁকে। তৃণমূলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত৷
advertisement
কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকেই বদলাতে শুরু করে সমীকরণ৷ মুকুল রায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তৃণমূলের। এর পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এবং বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়র সঙ্গে বৈঠক করায় মুকুলকে ৬ বছরের জন্য সাসপেন্ড করে তৃণমূল। বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার আগে ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর রাজ্যসভার সদস্য পদ ছাড়েন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী।
এরপরে মুকুল রায় ৩ নভেম্বর ২০১৭-এ তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগদান দেন। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে গেরুয়া শিবিরের হয়ে মুকুল বড় ভূমিকা নিলেও তাঁকে কোনও পদ দেয়নি বিজেপি। বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার প্রায় ৩ বছর পরে ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পর থেকেই কিছুটা পিছনের সারিতে চলে যান মুকুল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তিনি বিজেপির কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে জয়ী হন৷
ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পরে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন মুকুল। সঙ্গে স্ত্রী কৃষ্ণাও। ২ জুন কৃষ্ণা রায়কে দেখতে হাসপাতালে যান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধরণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরু হয় মুকুল-জায়ার অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি। অভিষেক হাসপাতালে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কৃষ্ণা রায়কে দেখতে যান দিলীপ ঘোষ। পর দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোন পান মুকুল রায়।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর, ১১ জুন, ২০২১, তপসিয়া তৃণমূল ভবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে ফিরে আসেন তাঁর পুরানো দলে। ২৫ জুন ২০২১-এ, তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার দ্বারা PAC- এর সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে ১৪ জুলাই ২০২১-এ PAC-এর চেয়ারম্যান হন। অসুস্থতার কারণে ২৭ জুন ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদা ইস্তফা জমা দেন মুকুল রায়।
কিন্তু, তাঁর বিধায়ক পদ খারিজ মামলা দীর্ঘদিন চলে আদালতে৷ বিধানসভায় মুকুল রায়ের দলত্যাগ মামলা নিয়ে মোট ১২ টি শুনানি হয়। সেই দীর্ঘ শুনানি পর্বের পর স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, মুকুল রায় দলত্যাগ করেননি। তিনি বিজেপিতেই রয়েছেন।
পরবর্তীকালে বিধানসভার অধ্যক্ষের এই রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে যান বিজেপি বিধায়করা। আদালতের তরফ থেকে বিধানসভার অধ্যক্ষকে বলা হয়, প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার জন্য। সে ক্ষেত্রে বিজেপির থেকে বক্তব্য ছিল, তাঁদের কাছে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বেশ কিছু ছবি ও নথিপত্রও জমা দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২২ সালের ৮ জুন, দলত্যাগের সেই অভিযোগ আবারও খারিজ করে দেন বিধানসভার অধ্যক্ষ। হাইকোর্ট ১৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করে৷
সুপ্রিম কোর্টের তরফে অবশ্য তাঁর অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়ে, তাঁর বিধায়ক পদ রেখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
