শান্তিনিকেতনের কোল ঘেঁষে থাকা বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের নামকরণের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে বেশ কিছু জনশ্রুতি।সবচেয়ে জনপ্রিয় মতানুসারে, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে প্রচুর শিব মন্দির ছিল। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মহাদেব বা শিবের আরাধনায় ‘বলি’ (উৎসর্গ) দেওয়ার প্রথা ছিল।এই ‘বলি’ এবংবসতি বা ‘পুর’—এই দুই শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ‘বলিপুর’, যা কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে আজকের ‘বোলপুর’ ।
advertisement
আরও পড়ুন – Old Is Gold: বয়স মানে না বাধা, পেশায় ছিলেন শিক্ষিকা, জ্যাভলিন- ডিসকাস ছুঁড়ে দেশকে এনে দিলেন ডবল সম্মান
বোলপুরের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে, এই জনপদটি ছিল এক ঘন জঙ্গলে ঘেরা। ডাকাতদের উপদ্রব আর শাল-পিয়ালের ছায়ায় ঢাকা এই গ্রামটি ছিল সুপুর পরগনার অধীনে। তৎকালীন সময়ে বোলপুর ছিল মূলত ধান এবং চাল ব্যবসার একটি বড় কেন্দ্র। ১৮৬০-এর দশকে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাত ধরে রেলওয়ে লুপ লাইনের বিস্তার ঘটছে, তখনই প্রথম এই রাঙা মাটির বুক চিরে রেলের বাঁশি বেজে ওঠে। এরপর ১৮৬৩ সালে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাতিমতলায় এসে শান্তিনিকেতনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন, সেই থেকেই ভাগ্য বদলাতে শুরু করে বোলপুরের। রেলগাড়ি করে কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে আসার সেই যাত্রাপথেই জন্ম হয় এক নতুন রেনেসাঁর।
“আমি পৃথিবীর কবি, যেথায় যা আছে মোর তপ্ত হৃদয়ে জাগে”— রবিকবির এইআহ্বান যেন আজও বোলপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্ল্যাটফর্মে প্রতিধ্বনিত হয়। তবে শান্তিনিকেতনের সেই চিরচেনা বোলপুর রেলস্টেশন এখন আর শুধু ট্রেনছাড়ার পুরনো প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অমৃত ভারত স্টেশন’প্রকল্পের অধীনে এই স্টেশনটি আজ এক নতুন ঊষার দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে। শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেই এই স্টেশনে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বোলপুর স্টেশনের ভোল বদলে দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ। এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। স্টেশন বিল্ডিংটিকে শান্তিনিকেতনের শিল্প ও সংস্কৃতির আদলে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।বয়স্ক এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সুবিধার জন্য থাকছে নতুন লিফট এবং এসকালেটর এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য থাকছে নিচু উচ্চতার টিকিট কাউন্টার, দৃষ্টিহীন মানুষদের চলাচলের জন্য বিশেষ খাঁজকাটা রাস্তা। স্টেশনের এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত আধুনিক ফুট ওভার ব্রিজ।
স্মার্ট কানেক্টিভিটির কথা মাথায় রেখে থাকছে মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জিং পয়েন্ট এবং উচ্চগতির ওয়াই-ফাই। এছাড়াও ওয়াটার কুলার এবং উন্নতমানের RO জল পরিষেবা প্রদানের পাশাপাশি টিকিট কাটার জন্য থাকছে ATVM। নিরাপত্তার জন্য থাকছে সিসিটিভি নজরদারি। যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত আধুনিক শৌচাগার নির্মাণ করা হচ্ছে ।পরিবেশবান্ধব পরিবহনের জন্য ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) চার্জিং পয়েন্টে এর বাবস্থা থাকছে । যেহেতু শান্তিনিকেতন একটি বিশ্বখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র, তাই পর্যটকদের গাইড করার জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র খোলা হতে চলেছে। স্টেশনের চারপাশে গাছপালা ও সুন্দর আলো দিয়ে সাজিয়ে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। গাড়ি এবং সাইকেলের জন্য বিশাল এলাকা জুড়ে সুপরিকল্পিত পার্কিং জোন তৈরি হচ্ছে। এক স্টেশন এক পণ্য (OSOP)স্কিমের অধিনে স্থানীয় হস্তশিল্প ও সামগ্রীর প্রসারের জন্য স্টেশনে বিশেষ স্টল বা কিয়স্কের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
অমৃত ভারত প্রকল্পের হাত ধরে বোলপুর-শান্তিনিকেতন স্টেশনের যে আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, তার মূল লক্ষ্য হলো স্টেশনটিকে কেবল একটি রেল স্টেশনে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ‘সিটি সেন্টার’ বা শহরের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করা। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্মমানে স্বীকৃত শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীর কারণে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানে আসেন। নতুন Tourist Facilitation Centre এবং স্টেশনের শান্তিনিকেতনী স্থাপত্যের সাজসজ্জা পর্যটকদের প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করবে। এটি স্থানীয় টোটো চালক, গাইড এবং হোটেল ব্যবসার উন্নতিতে সরাসরি সাহায্য করবে। সহজ কথায়, অমৃত ভারত প্রকল্পের ফলে বোলপুর স্টেশন তার পুরনো ছক থেকে বেরিয়ে একটি আধুনিক, নিরাপদ এবং শৈল্পিক স্টেশনে পরিণত হতে চলেছে, যা বীরভূম জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চেহারাই বদলে দেবে।
