অনেকেই উত্তেজনার বশে ২৬ জানুয়ারির অনুষ্ঠানকে ‘ফ্ল্যাগ হোইস্টিং’ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু আসলে প্রজাতন্ত্র দিবসে যা হয়, তাকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাগ আনফার্লিং’। সংবিধান ও সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী, ১৫ অগস্ট এবং ২৬ জানুয়ারির পতাকা উত্তোলনের ধরনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
‘যাত্রীদের পছন্দের স্বাধীনতা থাকতে হবে’! বন্দে ভারত স্লিপারের নিরামিষ মেনু ঘিরে তৃণমূল–বিজেপি তরজা
advertisement
১৫ অগস্ট, অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা মাটি থেকে উপরে তোলা হয়। এটি একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থানের প্রতীক। অন্যদিকে ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসে পতাকা আগেই দণ্ডে বাঁধা থাকে। রাষ্ট্রপতি দড়ি টেনে সেটিকে খুলে দেন—এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘ঝান্ডা ফারানো’ বা আনফার্লিং। এর অর্থ, ভারত ইতিমধ্যেই স্বাধীন এবং এই দিনটি সংবিধান কার্যকর হওয়ার উদযাপন।
প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজের সময়সূচি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে নির্ধারিত। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে জাতীয় পতাকা উন্মোচনের পিছনেও রয়েছে নির্দিষ্ট যুক্তি। সাধারণত ১০টা ২৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান অতিথি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছন। ঠিক ১০টা ৩০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি পতাকা উন্মোচন করেন এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। তার পরই ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে কুচকাওয়াজ শুরু হয়।
এই সময় বেছে নেওয়ার একটি বড় কারণ আবহাওয়া। সকালবেলার কুয়াশা তখন অনেকটাই কেটে যায়, আকাশ পরিষ্কার থাকে, ফলে বিমান বাহিনীর ফ্লাইপাস্ট এবং সরাসরি সম্প্রচারে দৃশ্যমানতা ভালো হয়। পাশাপাশি, আলোও থাকে ছবি ও সম্প্রচারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসও। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সকালে ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সকাল প্রায় ১০টা ২৪ মিনিটে শপথ নেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই, আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ, জাতীয় পতাকা উন্মোচন করে ভারতকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সম্মান জানাতেই আজও এই সময় বজায় রাখা হয়।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—২৬ জানুয়ারিতে কেন শুধু রাষ্ট্রপতিই পতাকা উন্মোচন করেন, প্রধানমন্ত্রী নয়। এর উত্তর লুকিয়ে আছে সাংবিধানিক কাঠামোয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক প্রধান, তাই স্বাধীনতা দিবসে তিনিই পতাকা উত্তোলন করেন। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস সংবিধানের কার্যকর হওয়ার দিন। রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের সাংবিধানিক প্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তাই এই দিনে জাতীয় পতাকা উন্মোচনের অধিকার তাঁরই।
২০২৬ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা ভারতের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের দিকটি তুলে ধরে। এ বছরের কুচকাওয়াজের থিম ‘বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর’। সেই কারণেই ট্যাবলোতে একদিকে যেমন আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক শক্তির প্রদর্শন, তেমনই উঠে আসে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সংগীতের ধারা।
সব মিলিয়ে, প্রজাতন্ত্র দিবসের সকাল ১০টা ৩০ মিনিট কেবল একটি সময় নয়—এটি ইতিহাস, সংবিধান, প্রোটোকল এবং জাতীয় চেতনার এক গভীর প্রতীক।
