দিল্লিতে লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের লনে আজকাল দেশ-বিদেশের অতিথিদের সঙ্গে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। তবে ‘পরীক্ষা পে চর্চা’র সম্প্রচারের সময় সেই লনেই কোনও সেলিব্রিটি নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরাই মোদির সঙ্গী ছিল। কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে খুবই স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে তাঁদের সঙ্গে আড্ডা দেন প্রধানমন্ত্রী।
advertisement
থিম ছিল পরীক্ষা, কিন্তু কথাবার্তায় উঠে আসে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। ঘরোয়া ভঙ্গিতে এমনভাবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের পথ দেখান, যেন পরিবারের কোনও অভিভাবক বন্ধুর মতো করে সন্তানদের বোঝাচ্ছেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের জনজীবনে তাঁর সাফল্যই প্রমাণ করে, মানুষের সঙ্গে সংলাপে তিনি কতটা দক্ষ।
মোদি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর লক্ষ্য শুধু ক্ষমতায় থাকা বা দেশকে অর্থনৈতিক মহাশক্তি বানানো নয়; পাশাপাশি তিনি মূল্যবোধ গঠনের কথাও ভাবেন। নতুন প্রজন্মকে মানসিক ও নৈতিকভাবে প্রস্তুত করাই তাঁর অগ্রাধিকার। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’র নবম সংস্করণে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় বার্তা। আগের তুলনায় এই পর্ব আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরীক্ষামূলক বলে মনে করেছেন দর্শকরা। বিশেষ করে এক প্রতিবন্ধী ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেকের মন ছুঁয়েছে।
এই বক্তব্যের মধ্যেই সাংস্কৃতিক বার্তাও দেন প্রধানমন্ত্রী। অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক গামছা অনেক ছাত্রছাত্রীর গলায় দেখা যায়। এক সময় যে উত্তর-পূর্ব অঞ্চল অবহেলার শিকার ছিল, গত বারো বছরে তা দেশের মূল স্রোতে এসেছে—অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সব দিক থেকেই। গামছার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের বোধ জাগ্রত করাই ছিল মোদির উদ্দেশ্য।
পুরো অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এতটাই সহজ-স্বাভাবিক ছিলেন যে ছাত্রছাত্রীরা মনে করছিল না, তাঁরা দেশের সেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছে, যাঁর কথা আন্তর্জাতিক মহলেও মন দিয়ে শোনা হয়। তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ুয়াদের কথা শোনেন, তারপর তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেন এমনভাবে, যা সহজেই বোঝা যায়।
গেমিং নিয়েও কথা বলেন মোদি। সাম্প্রতিক কিছু মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, খেলাধুলোর বিরুদ্ধে তিনি নন, কিন্তু গেমকে স্কিল হিসেবে নিতে হবে, জুয়া বা সাট্টা দিকে গেলে সর্বনাশ অনিবার্য। তাঁর সতর্কবার্তা—এই আসক্তি শুধু ব্যক্তিকে নয়, গোটা পরিবারকেও ধ্বংস করতে পারে।
আলোচনায় আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রসঙ্গও। এআই নিয়ে ভয় না পেয়ে কীভাবে পড়াশোনা ও কাজকে সহজ করা যায়, সেই দিকেই নজর দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পড়াশোনায় মনোযোগ, নম্বর বনাম স্কিল, বোর্ড ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অগ্রাধিকার—সব বিষয়েই তিনি দিকনির্দেশ দেন। শিক্ষকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ছাত্রদের গতি অনুযায়ী এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে, খুব বেশি এগোলে পড়ুয়ারা পিছিয়ে পড়বে।
নিজের জীবনকথার উদাহরণ টেনে মোদি বলেন, লক্ষ্য স্থির রেখে কঠোর পরিশ্রম করলে যে কেউ সাফল্য পেতে পারে। গুজরাটের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের নেতৃত্বে পৌঁছনোর পথ তাঁর জীবন্ত প্রমাণ। তাই তিনি যখন স্বপ্ন দেখতে ও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেগে পড়তে বলেন, তখন নতুন প্রজন্ম তাঁর কথায় আস্থা রাখে।
মোদির বার্তা স্পষ্ট—স্বপ্ন না দেখা অপরাধ, কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, তা পূরণ করতে হবে নিরলস পরিশ্রমে। ২০৪৭ সালের উন্নত ভারতের লক্ষ্য পূরণে দেশের কিশোর ও যুবসমাজের উপরই তাঁর সবচেয়ে বেশি ভরসা। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’র মাধ্যমে সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রস্তুতিই নিলেন প্রধানমন্ত্রী।
