৩৩ বছর বয়সী গৃহবধূ মাধবীলতা কুণ্ড বর্ধমানের বাসিন্দা। তিনি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কিডনি প্রতিস্থাপন করান। গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ চলাকালীন অবস্থায় তিনি হাসপাতালে আসেন। এর আগে তাঁর একবার সিজারিয়ান প্রসব, একবার গর্ভপাত, উচ্চ রক্তচাপ এবং থাইরয়েডের সমস্যা ছিল। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর গর্ভধারণ স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। বিস্তারিত পরামর্শ এবং পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে নেফ্রোলজি, স্ত্রীরোগ, অজ্ঞানবিদ্যা, সংকটজনিত চিকিৎসা ও নবজাতক বিভাগের চিকিৎসকেরা যৌথভাবে কঠোর নজরদারির মধ্যে গর্ভধারণ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
advertisement
গর্ভাবস্থার ২১ সপ্তাহে রোগীর একাধিক জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিস্থাপিত কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা, তীব্র রক্তাল্পতা, রক্তে বর্জ্য পদার্থের মাত্রা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ এবং সংক্রমণ ধরা পড়ে। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে রক্ত দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ পরিবর্তন এবং সংক্রমণের নিবিড় চিকিৎসা শুরু করা হয়। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আরও পড়ুনঃ মানহানি অভিযোগে আইনি চাপে মিমি চক্রবর্তী, বনগাঁ আদালতে তনয় শাস্ত্রীর হয়ে তরুণজ্যোতি তিওয়ারি মামলা
অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও গর্ভাবস্থার ২৮ সপ্তাহে আবার কিডনির বিভিন্ন পরীক্ষার ফল খারাপ হতে শুরু করে, রক্তচাপ ওঠানামা করে, গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি কমে যায় এবং গর্ভের জলও কমে যায়। এতে মা ও প্রতিস্থাপিত কিডনির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়।
নেফ্রোলজি, স্ত্রীরোগ, অজ্ঞানবিদ্যা ও নবজাতক বিভাগের চিকিৎসকদের আলোচনার পর মায়ের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ৩০ সপ্তাহ ৩ দিনে পরিকল্পিত সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উন্নত অজ্ঞানবিদ্যা ও নবজাতক পরিচর্যার সহায়তায় ১.৬ কেজি ওজনের একটি কন্যা শিশুর জন্ম হয়। জন্মের পরই শিশুটি কান্নাকাটি করে এবং তাকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়, যেখানে ২০ দিন বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডাঃ শিল্পিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “শুরু থেকেই এই গর্ভধারণ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রোগীর শরীরে একাধিক জটিলতা ছিল এবং সামান্য পরিবর্তনও মা ও শিশুর জন্য বিপজ্জনক হতে পারত। আমাদের লক্ষ্য ছিল মায়ের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে শিশুর উপর নিয়মিত নজর রাখা। চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সতর্ক পর্যবেক্ষণের ফলে আমরা নিরাপদভাবে গর্ভকাল এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি।”
ডাঃ উপল সেনগুপ্ত বলেন, “কিডনি প্রতিস্থাপনের পর গর্ভধারণ স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে প্রতিস্থাপিত কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কিডনির কার্যকারিতা রক্ষা করে নিরাপদভাবে গর্ভধারণ সম্পন্ন করা। এজন্য নিয়মিত মূল্যায়ন, ওষুধের সঠিক সমন্বয় এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই সাফল্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও বহুবিভাগীয় সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে।”
প্রসবের পর মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও মূত্রনালির সংক্রমণ দেখা দেয় এবং তাঁকে তিন দিন নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়। সময়মতো চিকিৎসায় তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল হয় এবং কিডনির পরীক্ষার ফলও উন্নতি করে। বর্তমানে মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মাধবীলতা কুণ্ড বলেন, “অনেক সময় মনে হয়েছে হয়তো আমার সন্তানকে হারাব বা প্রতিস্থাপিত কিডনির ক্ষতি হবে। কিন্তু চিকিৎসকেরা সবসময় পাশে ছিলেন, প্রতিটি বিষয় বুঝিয়ে বলেছেন এবং আমাকে সাহস দিয়েছেন। আজ আমার সন্তানকে সুস্থ দেখে সত্যিই অলৌকিক মনে হচ্ছে।”
চিকিৎসার দীর্ঘ সময় জুড়ে তাঁর স্বামী তাপস কুণ্ড, যিনি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত, সবসময় পাশে থেকে তাঁকে মানসিকভাবে সহায়তা করেছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সময়মতো পরামর্শ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকলে প্রতিস্থাপনের পর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণও সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব এবং জটিল শারীরিক সমস্যায় ভোগা বহু নারীর জন্য এটি নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
