এবিসি নিউজের খবরে বলা হয়েছে, জার্মান সেনাবাহিনী গ্রিনল্যান্ড থেকে তাদের দল প্রত্যাহার শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ১৫ জন জার্মান সেনা একটি অসামরিক বিমানে কোপেনহেগেনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপ এবং হুমকির সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জার্মানি যেমন কৌশলগত সংযম দেখিয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক সংযমও দেখিয়েছে। ইউরোপীয় বিশ্ব স্পষ্টতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করতে রাজি নয়। আটটি ইউরোপীয় দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের ঘোষণা করেছে।
advertisement
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিন আগে ইউরোপীয় দেশগুলির উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছিলেন। এই আদেশ সরাসরি আমেরিকার প্রাচীনতম মিত্রদের অর্থনীতির উপর আক্রমণ করেছে। ট্রাম্প ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড থেকে আসা পণ্যের উপর ভারী শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছিলেন- যে দেশগুলি সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে ছোট সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছিল।
শুল্কের হিসেব:
– ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ থেকে এই দেশগুলি থেকে আসা পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০% শুল্ক আরোপ করা হবে।
– দাবি পূরণ না হলে ১ জুন, ২০২৬ থেকে এই শুল্ক ২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
– ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ড না কেনার আগে পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞাগুলি বহাল থাকবে।
– ইতিহাসে এই প্রথম কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধে গিয়ে ‘জমি কিনতে’ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র ব্যবহার করেছেন।
জার্মানির ইউ-টার্ন:
জার্মানির ১৫ সদস্যের গোয়েন্দা দল প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে বার্লিন ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি বা সরাসরি সামরিক সংঘাতের উসকানি দিতে ইচ্ছুক নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বিবেচনা হিসেবে বর্ণনা করা হলেও বিশ্লেষকরা এটিকে ট্রাম্পের হুমকির পর ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। জার্মানির অর্থনীতি ইতিমধ্যেই মন্দার কবলে পড়েছে এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি এখন নিতে চায় না তারা।
আরও পড়ুন– মাঘে কমবে শীত ! কতটা বাড়বে রাজ্যের তাপমাত্রা? দেখে নিন
ইউরোপ পাল্টা আঘাত হেনেছে, তারা ঐক্যবদ্ধ:
জার্মানি সেনা প্রত্যাহার করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নেতৃত্ব ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন ট্রাম্পের চাপের প্রতি স্পষ্টাস্পষ্টি বার্তা দিয়েছেন। “আমরা আর্কটিকের শান্তি ও নিরাপত্তায় আমাদের যৌথ ট্রান্সআটলান্টিক স্বার্থের উপর ধারাবাহিকভাবে জোর দিয়েছি,” তিনি এক্স-এ লিখেছেন। “ইউরোপীয় সৈন্যদের নিয়ে ড্যানিশ মহড়া পূর্বপরিকল্পিত ছিল। এটি কারও জন্য কোনও হুমকি নয়।” তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে শুল্ক ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ককে দুর্বল করবে এবং বিপজ্জনক অবনতির ঝুঁকি ডেকে আনবে। “ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ, সমন্বিত এবং তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”, লিখেছেন তিনি।
কাজা ক্যালাস বলছেন চিন এবং রাশিয়া মজা লুটছে:
EU-র পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা ক্যালাস এই সংঘাতের কঠোর সত্য বিশ্বের কাছে প্রকাশ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে যখন দুটি মিত্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ, যুদ্ধ করবে, তখন শত্রুর লাভ হবে। তিনি লিখেছেন, চিন আর রাশিয়ার জন্য এটি একটি মজার দিন হবে। মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তাদের উপকারে আসবে। যদি গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে আমরা ন্যাটোর মধ্যেই এটি সমাধান করতে পারি, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়। ক্যালাস আরও মনে করিয়ে দেন যে এই বিরোধ ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ থেকে মনোযোগ বিচ্যুত করার একটি উপায়, যেখানে রাশিয়া ক্রমাগত আক্রমণ চালাচ্ছে। ট্রাম্পের শুল্ক ইউরোপ এবং আমেরিকা উভয়কেই দরিদ্র করবে এবং সবার ভাগ করে নেওয়া সমৃদ্ধি ধ্বংস করবে, অভিমত তাঁর।
ম্যাকরঁ বলছেন সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কোনও আপোস নয়:
ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাকরঁ দৃঢ় ভাষায় বলছেন, ‘‘ফ্রান্স জাতির সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনও হুমকি বা ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা আমাদের প্রভাবিত করবে না- না ইউক্রেনে, না গ্রিনল্যান্ডে, না বিশ্বের অন্য কোথাও। শুল্ক হুমকি অগ্রহণযোগ্য।’’
ব্রিটেনেও সমালোচনা:
অন্য দিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারও স্পষ্টভাবে বলছেন যে ন্যাটো মিত্রদের সম্মিলিত নিরাপত্তা অনুসরণকারী বন্ধুদের উপর শুল্ক আরোপ করা সম্পূর্ণ ভুল।
১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখের দিকে সবার নজর:
জার্মানির সৈন্য প্রত্যাহার ট্রাম্পের জন্য একটি ছোট জয় হতে পারে, কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হাল ছাড়তে রাজি নয়। সকলের দৃষ্টি এখন ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখের দিকে। ট্রাম্প কি সত্যিই তাঁর নিকটতম বন্ধুদের উপর ১০% কর আরোপ করবেন? যদি তাই হয়, তাহলে এটি পশ্চিম ঐক্যের অবসান এবং একটি নতুন, অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হতে পারে। কেন না, ইতিমধ্যেই একসময় বরফের চাদরের নিচে নীরব থাকা গ্রিনল্যান্ড বিশ্ব ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে।
