এই যুদ্ধ শুধু তেল ও গ্যাসকেই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র শুধু সরকারি দপ্তর বা আবাসনেই নয়, ধনীদের সম্পদকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
হামলার আশঙ্কায় এই দেশগুলোর ধনী ও কোটিপতিরা এখন সেখান থেকে টাকা তুলে অন্য দেশে পাঠাতে শুরু করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই ধনীরা তাদের অর্থ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগ করছেন।
advertisement
১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করা ব্যাংকার ও আর্থিক পরামর্শদাতারা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের পর সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগের প্রবাহ বেড়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা ওই দেশগুলোর ধনীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন তাদের মূলধন এমন জায়গায় বিনিয়োগ করতে চাইছেন, যা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে দূরে। তাদের এই খোঁজ অনেকটাই সুইজারল্যান্ডে গিয়ে পূরণ হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মতে, সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং গোপনীয়তা আইন এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দ করে তুলছে। আগামী কয়েক মাসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সেখানে অর্থপ্রবাহ আরও বাড়বে বলেও মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন- ইরান যুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন ট্রাম্প! মার্কিন সেনেটরের দাবিতে বাড়ছে জল্পনা
বিনিয়োগকারীরা শুধু নগদ অর্থই নয়, সোনা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্পদেও বিনিয়োগ করছেন, যাতে যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো যায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিলিয়নিয়র ও ব্যবসায়ীরা তাদের সম্পদ সেখান থেকে সরিয়ে সুইজারল্যান্ডে পাঠাচ্ছেন। গত তিন বছরে সেখানে বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
Swiss Bankers Association-এর প্রধান মার্টিন হেস-এর মতে, সুইজারল্যান্ড নিজেকে একটি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে।
অন্যদিকে Deloitte-এর সুইজারল্যান্ড শাখার ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট প্রধান প্যাট্রিক স্পিলার বলেন, ইরানের ওপর হামলার পর থেকেই সেখানকার সম্পদ দ্রুত সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তরিত হচ্ছে। তাঁর আশা, আগামী দিনে সেখানে আরও বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সুইজারল্যান্ডে অর্থের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই নয়, বরং ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরাও এখন সুইজারল্যান্ডের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ফলে সুইস ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ সংক্রান্ত অনুসন্ধানও ক্রমাগত বাড়ছে।
সুইডারল্যান্ডের কাছে না আছে তেল, না সোনা, না লোহা—এমনকী বড় কোনও প্রাকৃতিক সম্পদও নেই। তবুও দেশটির অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিনিয়োগকারীরা এখানে অর্থ বিনিয়োগ করেন। পুরু বরফে ঢাকা এলাকা, উঁচু উঁচু পাহাড় এবং দুর্গম জমির কারণে এখানে বড় আকারের কৃষিকাজ বা ভারী শিল্প গড়ে তোলাও সহজ নয়। তার পরও বিশ্বের অনেক ধনী ও বিলিয়নিয়ার এই দেশে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করেন।
এর সবচেয়ে বড় কারণ হল, স্থিতিশীল রাজনীতি এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আসলে সে দেশের সরকার ১৯৩৪ সালে Federal Act on Banks and Savings Banks (ধারা ৪৭) চালু করে, যার ভিত্তিতে Swiss Banking Secrecy Act কার্যকর করা হয়। এই আইনের কারণে সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা ব্যক্তিদের পরিচয় সাধারণত প্রকাশ করা হয় না।
এই গোপনীয়তাই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি। যার ফলে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সেখানে আসতে শুরু করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই গোপনীয়তার কারণেই Swiss Franc মুদ্রাটিও বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। যখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, তখন বিনিয়োগকারীরা আবারও সুইস ব্যাংকের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
