নিজের প্রথম বই ‘ রাহুলের স্ক্র্যাপবুক’-এ, ‘বিবাহ অভিযান লাইভ: ঘটে লুকানো মাইক’ প্রবন্ধে রাহুল লিখছেন, সেই ছোট্ট বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন, ‘বিয়ে একটা বিশেষ জিনিস, তাতে বেজায় মজা! সেই মজার বিশেষ আকর্ষণ বর ও বউ নামক চরিত্রদুটি।’ রাহুলের যখন ৬ বছর বয়স, মামার বিয়ের হয়। সে এক বিরাট ব্যাপার! রাহুলের মায়েরা পাঁচ বন, তার পর এক মামা। সেই বিয়েতে রাহুলের একটাই আবদার, ”আমাকে মাখন জিন্স কিনে দিতে হবে।” সে চকচকে এক জাতীয় প্যান্ট। সেই প্রথম রাহুলের পার্লার দেখা। মামার বিয়েতেই রাহুলের প্রথম ক্যাটারার দেখা। ভাই-বোনদের মধ্যে মেনু কার্ড জমানোর একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।
advertisement
পরের অভিজ্ঞতা মানিক কাকুর বিয়ে। রাহুলের বাবার খুড়তুতো ভাই। বাসি বিয়ের দিন কালবৈশাখী এল। তেড়ে আম কুড়ালেন সব্বাই! তার পর ছোড়দার বিয়ে! বিয়ের ঘনঘটা পেরিয়ে রাহুলের নিজের বিয়ে! দু বছর লিভ-ইন করার পর রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা সিদ্ধান্ত নিলেন, ” এতই যখন অসহ্য, বিয়েটা করে নিলে কেমন হয়।” ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর বিয়ের তারিখ ঠিক হল! দু’জনেই লেগে পড়লেন বিয়ের কাজে! রাহুল বইতে লিখছেন, ” একটা নিউজ চ্যালেন বলেছিল, আমাদের বিয়ের লাইভ কভারেজ করবে। আমার মনটা শুরুতে একটু কুডাক ডেকেছিল বটে, কিন্তু ওনারা অভিষেক আর ঐশ্বর্যর তুলনা টেনে নিয়ে আমায় এমন ঘাঁটলেন, যে আমি এলোমেলো হয়ে গেলাম। ভুলেই গেলাম অভিষেকের বাবা আর আমার বাবা একরকম নয়। বুক ঠুকে হঁ্যা বলে দিলাম।”
জোরদার ছিল বিয়ের আয়োজন। বিয়ের কার্ড এঁকে দিলেন ‘চন্দ্রবিন্দু’র সঙ্গীতশিল্পী উপল, বয়ান লিখে দিলেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। রাহুলের কথায়, ” চন্দ্রবিন্দু ছাড়া প্রেম নিবেদন করতে আমি জানতাম না।” দেখতে দেখতে এগিয়ে এল দিন। রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা মিলে কলজেস্ট্রিট থেকে বই কিনে তত্ব বানিয়েছিলেন। বিয়ের সকালে হাজির চ্যানেল! প্রথম প্রশ্ন, ‘কেমন লাগছে?’ রাহুলের ভাষায়, ” কী করে বলি তখন দই-খই তুমুল অ্যাসিডিটি বোধ করছি।
বিয়ে শুরু হল! সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে রাহুল লিখলেন, ”ঘাড়ের উপর দিয়ে দুঃসম্পর্কের জামাইবাবু, বোগলের তলা দিয়ে তার ছেলে মুখ বার করে রেখেছে! আমি নড়তে পারছিনা।” টিভিতে মুখ দেখাতে রাহুলকেই বিড়ের পিড়ি থেকে তুলে দেয় আর কী! ” আমার কাছের লোকেরা কোণঠাঁসা, পিশেমশাই আলোর তারে জড়িয়ে পড়ে গিয়েছেন। মায়ের বুড়ো মেসোর টাকে রিফলেক্টর খুলে পড়ে গিয়েছে। সে ভাঙা গলায় চেঁচাচ্ছে মাইরা ফ্যালাইসে, মাইরা ফ্যালাইসে!”
বিয়ে জুড়ে ক্যামেরায় মুখ দেখানোর তাড়া! যে পারছে বাচ্চাকে রাহুলের কোলে রেখে দিয়ে যাচ্ছে, যাতে ক্যামেরায় ভাল করে ছবি আসে। রাহুলের কথায়, ” একজন আবার আমার ধুতিতে হিসু করে দিল। পুরোহিতের গামছার আড়ালে বুম মাইক লুকানো ছিল যাতে মন্ত্রটা রেকর্ড করা যায়। পুরুত ঠাকর শুদ্ধি করার জন্য তার উপর গঙ্গাজল ঢেলে দিলেন সরল মনে। মাইক বিগড়ে গেল। চ্যানেলের লোক সেই মাইক হাতে হাঁপুশ নয়নে কাঁদছে। আমার এক দিদি ক্যামেরার সামনে ছেলেকে ছেড়ে দিয়েছে। সে গোটা বিয়ে ঘুরে ঘুরে ছোকাবাবু যায় লালজুতো পায় গেয়ে গেয়ে নেচে গেল”
অতঃপর শুষদৃষ্টি… ” সবকিছু ব্লার হয়ে গেল শুভদৃষ্টি চলার সময়। ওই সময়টা শুধু আমার আর প্রিয়াঙ্কার! বিশ্বাস করুন গোটা পৃথিবী স্লো-মোশনে চলছিল।” কিন্তু ঘটনার ঘনঘটা তখনও থামেনি! দুর্ঘটনা জারি ছিল! রাহুল লিখছেন, ”এক পাড়ার বৌদি প্রণাম করতে গিয়ে রঞ্জিত মল্লিকের পা খিমচে দিয়েছেন, জিত-দার জামার হাতা ধরে আমার এক ভাইপো ঝুলছে। সব মিলিয়ে আমারটা শুভ বিবাহ ছিল না, ছিল বিবাহ অভিযান।”
তথ্যঋণ: ‘রাহুলের স্ক্র্যাপবুক’, সপ্তর্ষি প্রকাশন
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিবাহ অভিযান’ শীর্ষক ইউটিউব ভিডিও
