অরিজিতের পেশাদার জীবন শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে রিয়ালিটি शो ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশ নিয়ে। সেই সময় তিনি খুব একটা নজরে না এলেও ব্যাক-অফিসে সংগীত প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করে, সংগীতের গাঠনিক দিকগুলো বুঝে ওঠার সুযোগ পান—কেন কোনও গান শূন্য শোনায়, কোথায় নীরবতা শব্দকে অর্থ দেয়—এসব শিক্ষা তাকে অন্য গায়কের চেয়েও আলাদা করে তোলে।
advertisement
২০১৩ সালে মুক্তি পায় “তুম হি হো”—যা ভিন্ন কোনো ধামাকার বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, বরং এক হোয়িসপার-সুরে আবেগকে এমন করে স্পর্শ করে যে তা দ্রুত সবদিকেই ছড়িয়ে পড়ে। সেই গান অরিজিতকে শুধু জনপ্রিয় নয়, “দরকারি” করে তুলেছে—প্রেম, ব্যথা, স্মৃতি সবকিছুর আবহ হিসাবে।
‘ইউনূস সুদখোর, খুনি, বিশ্বাসঘাতক!’ তীব্র আক্রমণ শেখ হাসিনার, ভোটের আগেই খেলা ঘুরবে বাংলাদেশে?
রুপোর দাম চিনে কেন এত চড়া? কেজিতে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা বেশি! তফাৎ কোথায় জানেন?
অরিজিতের কণ্ঠের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তা নির্দোষ, প্রায় ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি মনে হয়—সঙ্গে প্রচণ্ড পরিশ্রম আর আত্মসমর্পণ। তাই তাঁর গানগুলোয়ের সঙ্গে শ্রোতাদের আবেগগত সংযোগ এতই দৃঢ়। কিন্তু এই সংযোগের পাশাপাশি একটি শারীরিক ও মানসিক চাপও তৈরি হয়েছে। বারবার একই ধরনের আবেগেই গাইতে গিয়ে, এবং প্রত্যাশার ভারে ব্যস্ত শিল্পী নিজেও দমবন্ধ অনুভব করেছেন—এটিই তাঁর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পেছনের এক উল্লেখযোগ্য কারণ।
হলিউড-বলিউডের মঞ্চে অরিজিতের উপস্থিতি ছিল অনন্য—হুডি ও স্লিপার আবার সাধারণ পোশাকেই তিনি রেড কার্পেট এড়িয়ে গেছেন; ফেম-গেম নয়, সংগীত তাঁর কাছে সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে বহুসময় তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে, কিছু মানুষ তাঁকে অহংকারী বা অগ্রাহ্যও আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু তিনি সবকিছুর উত্তর সময়কে দিয়েছেন, আওয়াজ নয় নিজের সঙ্গীতকে দিয়েছেন।
অরিজিৎ সিং শুধু গাইলেন না—মন খুলে আবেগের ভাষায় কথা বললেন, তাই গানগুলো শ্রোতাদের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। এখন তিনি থেমে দাঁড়ালেও, তাঁর কণ্ঠ স্মৃতিতে, প্লেলিস্টে ও হৃদয়ে স্থির হয়ে থাকবে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অরিজিৎ সিং যেন ভারতের আবেগের নেপথ্য সাউন্ডট্র্যাক। তিনি প্রেম গেয়েছেন, কিন্তু তার থেকেও বেশি গেয়েছেন আকুলতা। তিনি সুখের গান গেয়েছেন, তবে সেই সুখ—যা কাঁপে। আবার হৃদয়ভাঙার গানও গেয়েছেন, নায়কের মতো নয়, বরং এমন একজন মানুষের মতো, যে সেই ভাঙন থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেনি।
এই কারণেই তাঁকে ঘিরে যে কোনও খবর—তাঁর নীরবতা, অনুপস্থিতি, গতি কমিয়ে দেওয়া বা সচেতন সিদ্ধান্ত—সবকিছু আলাদা ভাবে আঘাত করে। এটা স্রেফ সেলিব্রিটি সংক্রান্ত খবর বলে মনে হয় না। মনে হয় যেন কেউ আপনার আবেগের ঘরের আসবাব নতুন করে সাজিয়ে দিচ্ছে।
তাই অরিজিৎ সিংকে নিয়ে কথা বলা দরকার ঠিক সেইভাবেই, যেভাবে মানুষ আসলে তাঁর কথা বলে—ভালোবাসা, ক্লান্তি, গসিপ, সমালোচনা, নস্টালজিয়া এবং এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত মালিকানার অনুভূতি নিয়ে।
সব জায়গায় পৌঁছনোর আগে, তিনি ছিলেন শুধু আর পাঁচজনের মতোই
সবাই যখন তাঁকে চিনত না, তখন অরিজিৎ সিং কোনও দাপট নিয়ে মুম্বইয়ে আসেননি। ভাগ্যের ঘোষণা দিয়ে তাঁর আগমন হয়নি। তিনি এসেছিলেন নীরবে—পশ্চিমবঙ্গের ছোট শহর জিয়াগঞ্জ থেকে, যেখানে জীবন ধীর আর স্বপ্ন সাধারণত বাস্তববাদী।
তাঁর বাড়িতে সংগীত কখনও খ্যাতির শর্টকাট ছিল না। সংগীত মানে ছিল শৃঙ্খলা, প্রশিক্ষণ, নিয়ম। তাঁর মা গান গাইতেন। পরিবার ধ্রুপদি সংগীতকে সম্মান করত। তারকাখ্যাতির কল্পনা নয়, বরং বিশ্বাস ছিল—অনুশীলন করলে ভালো হওয়া যায়।
অবসর নিলেন অরিজিৎ৷
২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’-এ অংশ নিয়ে অরিজিৎ ছিলেন প্রতিভাবান, কিন্তু গণমানুষের কাছে খুব একটা মনে রাখার মতো নন। তিনি জেতেননি। জনপ্রিয়ও হননি। সবচেয়ে বড় কথা, সিনেমার প্রস্তাবও পাননি। আর সেই ব্যর্থতাই সবকিছু বদলে দেয়।
আলোয় ফেরার চেষ্টা না করে তিনি বেছে নেন দীর্ঘ পথ। একঘেয়ে পথ। তিনি কাজ করেন মিউজিক প্রোগ্রামার হিসেবে, সুরকারদের সহকারী হন। গান কীভাবে তৈরি হয়, ভাঙে, আবার গড়ে ওঠে—তা শেখেন। নোটের মাঝে নীরবতা কী কাজ করে, কেন কিছু গান ভালো গাওয়া সত্ত্বেও ফাঁকা লাগে—এসব বোঝেন।
এই নেপথ্যের সময়টাই তাঁকে মরিয়া গায়ক হতে দেয়নি। বরং তাঁকে এমন এক শিল্পী বানিয়েছে, যিনি সংগীতকে সত্যিই বোঝেন।
যেদিন “তুম হি হো” গোটা দেশকে থামিয়ে দিল
২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’ মুক্তির সময় কেউ ভাবেনি, “তুম হি হো” এমন প্রভাব ফেলবে।
গানটি কোনও আতশবাজি নিয়ে আসেনি। এসেছিল ফিসফিস করে। আর সেই ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।গানটি প্রযুক্তিগত দিক থেকে খুব চমকপ্রদ ছিল না। জাদুটা ছিল আবেগে। অরিজিতের কণ্ঠ আত্মবিশ্বাসী শোনায়নি। শোনায়নি নিশ্চিত। বরং এমন মনে হয়েছিল, যেন কেউ সব হারানোর মুখে দাঁড়িয়ে গান গাইছে।
ভারত সেই অনুভূতিটা সঙ্গে সঙ্গে চিনে নিয়েছিল। হঠাৎ করেই অরিজিৎ শুধু জনপ্রিয় নন, অপরিহার্য হয়ে উঠলেন। মিউজিক ডিরেক্টররা তাঁকে চাইতে লাগলেন। প্রযোজকেরা তাঁর উপর নির্ভর করতে শুরু করলেন। রোমান্টিক সিনেমা যেন তাঁর কণ্ঠে ভর দিয়েই হাঁটছিল। তবু তিনি মুহূর্তটাকে শুষে নেননি। নিজেকে হঠাৎ বদলাননি। তিনি শুধু… গাইতে থাকলেন। গানগুলো ঠিক জায়গায় এসে পড়তে থাকল।
কেন অরিজিতের গান মনে হয় শুধু আপনার জন্য?
মানুষ বলে, “অরিজিতের গান আলাদা করে লাগে”—এর একটা কারণ আছে।
কারণ তাঁর কণ্ঠে মনে হয় না, তিনি দর্শকের জন্য পারফর্ম করছেন। বরং যেন হঠাৎ করে মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে যাওয়া এক স্বীকারোক্তি। তিনি নিখুঁত হতে চান না। সুরকে চেপে ধরেন না। প্রয়োজন হলে কণ্ঠ ভেঙে যেতে দেন।
যেখানে ইন্ডাস্ট্রি নিখুঁত শোনার পেছনে ছুটছে, সেখানে অরিজিত মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছেন। আর মানুষ সেটাকেই বিশ্বাস করেছে। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার মূল্য ছিল। মানুষ শুধু তাঁর গান পছন্দ করেনি, আঁকড়ে ধরেছে। তিনি গায়ক থেকে হয়ে উঠলেন আবেগের অনুবাদক। প্রতিটি হৃদয়ভাঙা, প্রতিটি প্রেমের স্মৃতি যেন তাঁর কণ্ঠ চাইতে লাগল।
একজন মানুষের পক্ষে এটা ভীষণ ভারী ভূমিকা।
তারকা না হয়েও তারকা
অরিজিৎ যখন এড়ানো অসম্ভব হয়ে উঠলেন, তখনই তিনি অদ্ভুত এক কাজ করলেন—সেলিব্রিটি হওয়ার খেলায় নামলেন না।
অগুনতি সাক্ষাৎকার নয়। ঝলমলে পোশাক নয়। পুরস্কার মঞ্চে কান্নাভেজা ভাষণও নয়।
হুডি, স্লিপার পরে হাজির হলেন। রেড কার্পেট এড়িয়ে গেলেন। খ্যাতির সঙ্গে ছোটখাটো আলাপ এড়িয়ে চললেন।
দৃশ্যমানতায় তৈরি এক ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি বেছে নিলেন গোপনীয়তা। এতে অনেকেই বিরক্ত হলেন।
কেউ বললেন অহংকারী, কেউ বললেন অকৃতজ্ঞ। আবার কেউ মনে করলেন, এমন খ্যাতি অন্যরা পেলে প্রাণ দিয়ে দিত।
কিন্তু সত্যিটা সহজ—তিনি নজরে থাকতে ভালবাসেন না।
তিনি গান গাইতে ভালোবাসেন। ব্যস।
যখন অতিরিক্ত ভালোবাসাই চাপ হয়ে দাঁড়ায়
চূড়ান্ত সময়ে অরিজিৎ সর্বত্র। তারপর হঠাৎই—অতিরিক্ত সর্বত্র।
প্রতিটি বড় ছবি, প্রতিটি আবেগঘন দৃশ্য, প্রতিটি প্রেমের স্বীকারোক্তি।
তারপর ধীরে ধীরে সুর বদলাল।
দর্শক বলল, সব গান একরকম শোনায়। সমালোচকেরা বললেন, বলিউডে বৈচিত্র্য নেই। সোশ্যাল মিডিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
বিরোধাভাসটা এখানেই—যারা অরিজিত চাইছিল, তারাই আবার নতুন কিছু চাইছিল।
কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি ঝুঁকি নিতে চায়নি। নতুন কণ্ঠ তৈরির বদলে এক জনের উপর আরও ভর দিয়েছে।
ক্লান্তির মুখ হয়ে উঠলেন অরিজিত—অন্যায়ভাবে।
দুঃখের গান গাওয়া যতটা রোমান্টিক শোনায়, ততটা নয়
মানুষ দুঃখের গান রোমান্টিক করে দেখে। কিন্তু ভাবুন, বছরের পর বছর পেশাগতভাবে হৃদয়ভাঙা গাওয়া কেমন?
বারবার ক্ষতি, আকুলতা, অনুতাপের ভেতরে ঢোকা—চিকিৎসার জন্য নয়, ডেডলাইনের জন্য।
শিল্পীরা আবেগ স্টুডিওতে ফেলে আসেন না। বাড়ি নিয়ে যান।
অরিজিত একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন—খ্যাতি তাঁকে ক্লান্ত করেছে, প্রত্যাশা আনন্দ কেড়ে নিয়েছে, আর সংগীত কখনও কখনও আর মুক্তি মনে হয়নি।
দুঃখের জন্য পরিচিত হয়ে গেলে, সেই দুঃখ থেকে বেরোনো কঠিন।একবার পুরস্কার মঞ্চে প্রকাশ্য ক্ষমা চাওয়া খবর হয়ে যায়। সালমান খানের সঙ্গে মনোমালিন্য তাঁর কেরিয়ারে প্রভাব ফেলে। নিষেধাজ্ঞার গুঞ্জন, নীরব সমঝোতা—সবই হয়েছে।
অরিজিৎ কী করলেন? কিছুই না।
তিনি প্রতিবাদ করলেন না। ব্যাখ্যা দিলেন না। ক্যামেরায় কাঁদলেন না।
তিনি চুপ থাকলেন।
যে সংস্কৃতি উত্তেজনায় পুরস্কৃত করে, সেখানে নীরবতা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। কেউ পছন্দ করেছে, কেউ দুর্বলতা ভেবেছে।
কিন্তু অরিজিত বোধহয় গল্প জেতায় আগ্রহী ছিলেন না। সময়কেই উত্তর দিতে দিয়েছেন।
তিনি গান ছাড়লে আমাদের ভয় কেন?
যখনই অরিজিৎ কম কাজের কথা বলেন, আতঙ্ক শুরু হয়—“বলিউড কী করবে?”, “সংগীত শেষ!”, “সব শেষ!”
কিন্তু এই ভয় আসলে আমাদের।
আমরা পরিচিত আবেগের ভরকেন্দ্র ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু শিল্পীদের আমাদের স্বস্তির জন্য নিজেকে নিঃশেষ করার দায় নেই।
তিনি কম গান গাইলে, বেছে নিলে, নিজের শান্তি রক্ষা করলে—তাতে তাঁর গুরুত্ব কমে না। বরং গভীর হয়।
সমালোচনা যা ঠিক, আর যা নয়
কিছু সমালোচনা যুক্তিসঙ্গত। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে, বৈচিত্র্য চেয়েছে।
কিন্তু সব দায় তাঁর ঘাড়ে চাপানো বলিউডের কাজের ধরনকে উপেক্ষা করে।
গায়কেরা ট্রেন্ড ঠিক করেন না। স্ক্রিপ্ট বাছেন না। বিপণন নিয়ন্ত্রণ করেন না।
অরিজিত যা চাওয়া হয়েছে, সেটাই দিয়েছেন—সততার সঙ্গে।
একরকম হওয়াটা তাঁর সৃষ্টি নয়। সিস্টেমের নিরাপদ গণ্ডি।
শেষ কথা—তাঁর আসল উত্তরাধিকার
অরিজিত সিংয়ের উত্তরাধিকার পুরস্কার, সংখ্যা বা রেকর্ডে নয়। তা বেঁচে আছে নীরব মুহূর্তে—হেডফোনে কাঁদা, খারাপ খবরের পর লং ড্রাইভ, বিয়েতে আলতো বাজতে থাকা গান, বিদায়ের সময় যেখানে কথা যথেষ্ট নয়।
তিনি বলিউডে পুরুষ কণ্ঠের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। দুর্বলতাকে সম্মানজনক করেছেন। প্রমাণ করেছেন, নরম হওয়া দুর্বলতা নয়।
