সৃজার জীবনের গল্পটা সাফল্যের পাশাপাশি গভীর লড়াইয়ের। তাঁর বাবা বাবুল নমোশর্মা প্রায় ৩০ বছর পুলিশ প্রফেশনে যুক্ত ছিলেন। সৎ, নিষ্ঠাবান ও আদর্শবান পুলিশ অফিসার হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাবার উর্দি আর দায়িত্ববোধ সৃজার মনে বুনে দিয়েছিল পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন।
advertisement
কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। ২০১৮ সালে বাবুল নমোশর্মার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও চিকিৎসা-ব্যয়ের চাপে পরিবার পড়ে চরম আর্থিক সংকটে। সেই সময় প্রাইভেট কোচিং তো দূরের কথা, স্বাভাবিক পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তার মধ্যেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে আচমকাই বাবাকে হারান সৃজা। শোকের পাহাড় বুকে চেপে রেখেও বাবার স্বপ্নকেই নিজের শক্তি করে WBCS পরীক্ষায় বসেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ফল প্রকাশ হতেই জানা যায়, রাজ্যের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন সৃজা নমোশর্মা। শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর বিধানচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০২৩-২৪ সালে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মোট আটটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসে প্রতিটিতেই সাফল্য পান সৃজা। উল্লেখযোগ্য বিষয়, কোনও কোচিং ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।
বর্তমানে কলকাতার কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR)-এ অ্যাসিস্ট্যান্ট সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত সৃজা। কয়েকদিন আগে ছুটিতে শিলিগুড়ির বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময়ই আসে জীবনের অন্যতম বড় সাফল্যের খবর। আনন্দে ভরে ওঠে গোটা পরিবার।
তবে এই আনন্দের মাঝেও রয়ে গেছে একরাশ আক্ষেপ। সৃজা বলেন, “আজ বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে পুলিশের উর্দিতে দেখে সবচেয়ে খুশি হতেন।” আপাতত পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। ভবিষ্যতে আইপিএস হওয়ার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর চোখে।
সৃজার সাফল্যের খবর পেয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে বাড়িতে যান শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ-সহ আরও বিশিষ্টজনরা। তাঁদের উপস্থিতিতে আবেগঘন হয়ে ওঠে মুহূর্তগুলো।
এই পরিবারের সাফল্য এখানেই থেমে নেই। সৃজার ভাই বর্তমানে আইআইটি খড়্গপুরে পড়াশোনা করছে, যা পরিবারের শিক্ষার প্রতি অদম্য মনোভাবেরই প্রতিফলন।
মা মুন্নি নমোশর্মা আক্ষেপের সুরে বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে মেয়েকে ভাল কোচিং দিতে পারেননি তিনি। তবে চোখের জল আর হাসি মিলিয়ে তাঁর কণ্ঠে গর্বের সুর— “অভাবের মধ্যেও মেয়ে যে নিজের চেষ্টায় এত বড় জায়গায় পৌঁছেছে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
সব মিলিয়ে সৃজা নমোশর্মার এই সাফল্যের গল্প আজ শিলিগুড়ির অসংখ্য মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা— পড়াশোনা আর আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনও বাধাই যে শেষ কথা নয়, সেটাই যেন নতুন করে প্রমাণ করে দিলেন তিনি।