ট্রেনে যাতায়াত করছে 'কিং কোবরা'? ভাবতেও পারছেন না! প্রাণঘাতী 'সহ-যাত্রীদের' সম্পর্কে জানুন
- Published by:Tias Banerjee
Last Updated:
পশ্চিমঘাটের পাহাড়ি রেলপথ মানেই ধীর গতির যাত্রা, জানালার বাইরে সবুজ অরণ্য আর জলপ্রপাতের দৃশ্য। কিন্তু এই মনোরম ট্রেনযাত্রার মধ্যেই কখনও কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে অপ্রত্যাশিত বিপদ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—পশ্চিমঘাট অঞ্চলে ট্রেনে যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছে বিষধর কিং কোবরাকে। কীভাবে, কেন এবং এর প্রভাবই বা কী—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই গবেষকদের এই অনুসন্ধান, যা নতুন করে ভাবাচ্ছে মানব–বন্যপ্রাণ সম্পর্ক ও আধুনিক পরিকাঠামোর প্রভাব নিয়ে।
advertisement
advertisement
advertisement
পশ্চিমঘাটের কিং কোবরা গোয়া, কর্ণাটক, কেরল, মহারাষ্ট্র এবং তামিলনাড়ুতে পাওয়া যায়। দৈর্ঘ্যে এরা প্রায় ১৩ ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং বিশ্বের অন্যতম বিষধর সাপ হিসেবে পরিচিত। সাধারণ কিং কোবরা আবাস ধ্বংসের কারণে ‘ভালনারেবল’ শ্রেণিভুক্ত হলেও, পশ্চিমঘাটের কিং কোবরার বিস্তৃতি আরও সীমিত, ফলে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
advertisement
গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। ট্রেনযাত্রার মাধ্যমে এই বিষধর সাপেরা অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের আবাস এলাকা বাড়িয়ে ফেলছে। সমীক্ষায় গোয়ায় ট্রেনের মধ্যে পাওয়া ৪৭টি কিং কোবরা উদ্ধারের ঘটনার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই ঘটনাগুলি নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে উত্তর গোয়া জেলায় ১৮টি এবং দক্ষিণ গোয়া জেলায় ২৯টি ঘটনা ঘটেছে। সব ক’টি ক্ষেত্রেই পরে সাপগুলিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়।
advertisement
গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল গোয়ায় কিং কোবরার আবাস ও বিস্তৃতি বোঝা। কিন্তু অনুসন্ধানে আরও গভীর বিষয় সামনে আসে। গবেষণার প্রধান ও কিং কোবরা উদ্ধারকারী, লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর দ্য অ্যানালিসিস অব বায়োডাইভার্সিটি চেঞ্জ-এর সদস্য দীক্ষাংশ পারমার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, ট্রেনে দেখা সাপগুলিকে গ্রাম ও আশপাশের অরণ্য এলাকায় দেখা গেলেও, চাষের জমিতে তাদের দেখা যায়নি।
advertisement
পরিবেশগত তথ্যের সঙ্গে এই ঘটনাগুলির মানচিত্র মিলিয়ে দেখা যায়, গোয়ার পূর্বাংশ—যেখানে পাহাড়ি এলাকা, ঘন বন এবং জনঘনত্ব কম—সেখানেই কিং কোবরার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত আবাস রয়েছে। ৪৭টি উদ্ধারের অধিকাংশই এই অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়। তবে পাঁচটি ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম। উদ্ধার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই সাপগুলিকে এমন জায়গায় পাওয়া যায় যা তাদের স্বাভাবিক আবাসের সঙ্গে মেলে না।
advertisement
এই ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলিতে দেখা যায়, কিং কোবরাগুলি রেল অবকাঠামোর মধ্যে বা ঠিক পাশেই ছিল—যেখানে সাধারণত তাদের প্রয়োজনীয় বনাঞ্চলের আবরণ থাকে না। এর থেকেই গবেষকদের নতুন একটি তত্ত্ব উঠে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, শিকার খোঁজার সময় রেল স্টেশন বা রেলইয়ার্ড এলাকায় এসে দুর্ঘটনাবশত কিছু কিং কোবরা ট্রেনে উঠে পড়ছে।
advertisement
একবার ট্রেনে উঠে পড়লে, এই সাপগুলি নিজেদের অজান্তেই শত শত কিলোমিটার দূরে চলে যাচ্ছে। গবেষকরা এই ঘটনাকে ‘প্যাসিভ ট্রান্সপোর্ট’ বা নিষ্ক্রিয় পরিবহণ বলে আখ্যা দিয়েছেন—অর্থাৎ, নিজেরা চলাচল না করে মানব-নির্মিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া। পারমার ও তাঁর সহগবেষকদের মতে, এই প্রবণতা মানব-প্রাণী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
advertisement
এছাড়াও, প্রাণীদের নিয়মিত এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরে যেতে হলে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের মেলামেশা হয়, যার ফলে ‘জিন ফ্লো’ বা জিনগত বিনিময়ে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়তেও পারে, আবার স্থানীয় অভিযোজন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এর প্রভাব পড়তে পারে সাপদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীর জনসংখ্যার গতিবিধির উপরও। ট্রেনের মাধ্যমে সাপ শহরাঞ্চলে পৌঁছে গেলে মানুষ ও সাপ—দু’পক্ষই বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
advertisement
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই গবেষণা একটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরতে পারে। যদি মানুষ বুঝতে পারে যে সাপগুলি মানুষের উপর আক্রমণের চেয়ে খাবারের সন্ধানেই বেশি আগ্রহী, তাহলে কিং কোবরা বা অন্যান্য সাপ মেরে ফেলার প্রবণতা কমতে পারে। অন্যদিকে, সংরক্ষণবিদদের কাছে এই গবেষণা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—প্রাকৃতিক আবাসের মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
advertisement







