জীবনদর্শন থেকে রাজনীতি, ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো কীভাবে ভারতের সত্য সাই বাবার অনুরাগী হয়ে উঠলেন ? জেনে অবাক হবেন
- Published by:Siddhartha Sarkar
Last Updated:
How Venezuela’s Nicolas Maduro became a follower of Sathya Sai Baba: সত্য সাই বাবা এবং ভারতের সঙ্গে মাদুরোর সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল, ভেনেজুয়েলাতেই বা সত্য সাইয়ের প্রভাব কীভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, জেনে নেওয়া যাক এক এক করে।
নিকোলাস মাদুরো নামটি এখন ঘন ঘন উঠে আসছে খবরের সইরোনামে। তাঁকে বর্ণনা করা যায় অনেক ভাবেই, কারও কাছে তিনি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি, আবার কারও কাছে তিনি ভেনেজুয়েলার স্বৈরাচারী শাসক। আবার অনেকে তাঁকে চেনেন সত্য সাই বাবার একজন অনুরাগী হিসেবে। শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখ ভোরে কারাকাসে তাঁর কম্পাউন্ড থেকে মার্কিন বাহিনি তাঁকে গ্রেফতার করার পর পরই সবার মনোযোগ মাদুরোর ব্যক্তিগত জীবনের দিকে চলে গিয়েছে। উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য- প্রাক্তন বাস ড্রাইভার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা এই বিখ্যাত শাসক ভারতীয় ধর্মগুরুর শিক্ষার প্রবল অনুসারী ছিলেন। সত্য সাই বাবা এবং ভারতের সঙ্গে মাদুরোর সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল, ভেনেজুয়েলাতেই বা সত্য সাইয়ের প্রভাব কীভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, জেনে নেওয়া যাক এক এক করে।
advertisement
মাদুরো এবং ভারতীয় ধর্মগুরুর সম্পর্ক: ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে বেড়ে উঠেছিলেন মাদুরো। ২০০৫ সালে এসে সত্য সাই বাবার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। যদিও স্বামীর সঙ্গে এই ভারতীয় ধর্মগুরুর প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস, এই ঘটনা ঘটে তাঁদের বিয়ের আগেই। বলা হয় যে ভেনেজুয়েলার আয়রন লেডি ফ্লোরেস এই ভারতীয় ধর্মগুরুর একজন একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। ২০০৫ সালে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাদুরো তাঁর স্ত্রী সিলিয়াকে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের পুত্তাপর্তিতে সাই বাবার সঙ্গে দেখা করেন এবং আধ্যাত্মিক গুরুর আশীর্বাদ কামনা করেন। সত্য সাই কেন্দ্রীয় ট্রাস্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে: ‘‘২০০৫ সালে যখন তিনি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে প্রশান্তিনিলয়মে যান, তখন বাবা মাদুরো এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তখন বিদেশমন্ত্রী ছিলেন।’’
advertisement
এই প্রসঙ্গে না বললে নয় যে মাদুরো এবং ফ্লোরেসের মেঝেতে বসে থাকা অবস্থায় সত্য সাই বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু, ভারতীয় ধর্মগুরুর সঙ্গে মাদুরোর সম্পর্ক কেবল ২০০৫ সালের ভারত সফরের চেয়েও গভীর। নানা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে মাদুরো ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে সাইমন বলিভার এবং হুগো শ্যাভেজের ব্যক্তিগত অফিসের দেয়ালে সাই বাবার একটি প্রতিকৃতি ঝোলানো হয়েছিল।
advertisement
এছাড়াও বলা হয় যে রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তগুলিতে, যার মধ্যে অভ্যুত্থান এবং গণবিক্ষোভও অন্তর্ভুক্ত ছিল, ফ্লোরেস মাদুরোকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য ভাগ্য এবং ধৈর্য সম্পর্কে সাই বাবার শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। সত্য সাইয়ের প্রতি এই পারিবারিক বিশ্বাস শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযোগ তীব্রতর হওয়ার পরেও শক্তিশালী ছিল। তাছাড়া, ২০১১ সালে যখন সত্য সাই বাবা মারা যান, তখন মাদুরো একটি আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাবের জন্যও চাপ দেন। তাঁর নির্দেশনায় ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদ একটি আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাব পাস করে এবং গুরুর ‘‘মানবতার প্রতি আধ্যাত্মিক অবদান’’-কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একটি জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে।
advertisement
ভারতে সত্য সাই বাবার সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুসারীদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং ক্রিকেট কিংবদন্তি সচিন তেন্ডুলকর। সত্য সাই বাবার সংগঠন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকল্পেও টাকা দিয়েছে করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দেশজুড়ে নানা হাসপাতাল এবং ক্লিনিক। ২৪ এপ্রিল, ২০১১ তারিখে সত্য সাই বাবা ৮৪ বছর বয়সে মারা যান, যা কেবল ভারতে নয়, বিশ্বজুড়ে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। তবে শুধু মাদুরো নয়, ভেনেজুয়েলায় সত্য সাই বাবার অগণিত একনিষ্ঠ অনুসারী রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি ১১৩টি দেশের মধ্যে অন্যতম যেখানে সত্য সাই আন্দোলন রীতিমতো সক্রিয়। এই দেশের প্রথম সাই সেন্টারটি ১৯৭৪ সালে কারাকাসে খোলা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে দুই ব্যক্তি, আরলেট মেয়ার এবং এলিজাবেথ পামার, এই ধর্মগুরুর দর্শনের পর এটি শুরু হয়েছিল। সত্য সাইয়ের অনুসারী হওয়ার পর তাঁরা ২২ আগস্ট, ১৯৭৪ সালে কারাকাসে এই কেন্দ্রটি খুলেছিলেন। বহু বছর পরে ১৯৮৭ সালে EHV (মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা) শিক্ষকদের জন্য প্রথম কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
advertisement
দক্ষিণ আমেরিকার উপর দিয়ে উড়ন্ত একটি বিমানকে রক্ষা করার তথাকথিত অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর পর সত্য সাই বাবা ভেনেজুয়েলায় আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন। বলা হয়, ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের উপর দিয়ে একটি যাত্রীবাহী বিমান উড়ছিল, ঠিক তখনই ইঞ্জিনটি হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। পাইলট জানতেন যে বিমানে থাকা একজন ভেনেজুয়েলার বিমান পরিচারিকা সাই বাবার সমর্থক। তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘‘আপনার গুরুর কাছে প্রার্থনা করুন যাতে আমাদের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা যায়!’’ বিমান পরিচারিকা বাবার কাছে চিৎকার করে প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ককপিটের বাইরে আকাশে উপস্থিত হন। ইতিমধ্যে ইঞ্জিনটি কাজ শুরু করে এবং বিমানটি দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায়।
advertisement
এই ঘটনা ভেনেজুয়েলায় সত্য সাই বাবার মতাদর্শ প্রসারের নেপথ্য কারণ। পরবর্তী বছরগুলিতে সাই ট্রাস্ট এই দেশে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র এবং ইনস্টিটিউট খুলেছে। কারাকাস, মারাকায়, মারাকাইবো, বারকুইস্মেটো, কুমানা, সিউদাদ, বলিভার, পুয়ের্তো ওরদাজ, মেরিদা এবং মার্গারিটা দ্বীপের মতো বেশ কয়েকটি শহরে জনসাধারণকে এই ধর্মগুরু এবং তাঁর কাজ সম্পর্কে অবহিত করার জন্য জনসভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ৩,০০০-এরও বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ভেনেজুয়েলা যখন অনেক বিদেশি এনজিওকে বহিষ্কার করেছিল, সাই সেন্টারগুলি তখনও অবাধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। সত্য সাই বাবা এবং তাঁর শিক্ষার উপর মাদুরোর যে অগাধ বিশ্বাস ছিল, এই ঘটনা তা নতুন করে প্রমাণ করে।যাই হোক, মাদুরো তো এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি, মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে নিউ ইয়র্ক সিটিতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। সম্ভবত কারাগারে থাকাকালীন তিনি সত্য সাই বাবার শিক্ষা থেকেই সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন!






