‘ঐতিহ্য তো রয়েছে, ভবিষ্যত কী ?’ আতঙ্কের সুর জয়নগরের মোয়া নির্মাতার কাঁপা গলায়– News18 Bengali

বেছে নিন রাজ্য / কেন্দ্র

‘ঐতিহ্য তো রয়েছে, ভবিষ্যত কী ?’ আতঙ্কের সুর জয়নগরের মোয়া নির্মাতার কাঁপা গলায়

Sarmita Bhattacharjee | News18 Bangla
Updated:May 17, 2019 11:12 PM IST
‘ঐতিহ্য তো রয়েছে, ভবিষ্যত কী ?’ আতঙ্কের সুর জয়নগরের মোয়া নির্মাতার কাঁপা গলায়
Sarmita Bhattacharjee | News18 Bangla
Updated:May 17, 2019 11:12 PM IST

#জয়নগর: জয়নগরের মোয়া ৷ শীত আসলেই বাঙালির পাতে চাই-ই চাই এই মিষ্টি ৷ তবে, ভেজালের ঠেলায় আসল মোয়া তো পাওয়াই যায় না ৷ কারণ ক্যালেন্ডারের পাতায় অক্টোবর পেরোতে না পেরোতেই শহরের রাস্তায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠে মিষ্টির দোকান ৷ যার প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে ‘জয়নগরের মোয়া’ ৷ এই মোড়কের আড়ালেই বিক্রি হয় ‘ভেজাল মোয়া’ ৷

তবে, সে যাই-ই হোক না কেন ৷ জয়নগর আজও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে ৷ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ৷ এই তিন মাস ধরে নিয়ম মেনেই তৈরি হয় মোয়া ৷ কনকচূড় ধানের খই, নলেন গুড় দিয়ে তৈরি হয় এই মোয়া ৷ এই সময়টাতে রীতিমত উৎসব উৎসব রব পড়ে যায় গোটা এলাকায় ৷ স্থানীয় মানুষজন তো রয়েছেই ৷ দূর দূরান্ত থেকেও এই এলাকায় আসেন সাধারণ মানুষ ৷ এই মিষ্টির টানেই ৷ কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায় ৷ এই জয়নগরের মোয়া পুরোপুরিই একটি মরশুমি মিষ্টি ৷ যার জেরে বছরের ন’মাস কর্মহীন হয়ে পড়েন তাঁরা ৷ কীভাবে চলে তাঁদের সংসার ৷ সেটা জানতেই News18Bangla পৌঁছে গিয়েছিল জয়নগরে ৷

অল্পবিস্তর খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, জয়নগরের সবচেয়ে পুরোনো বুঁচকিবাবুর মিষ্টির দোকান ৷ জয়নগর পৌঁছে দোকানটি খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হল না ৷ ‘দাদা বুঁচকিবাবুর মিষ্টির দোকানটা কোথায় ?’ প্রশ্ন করতে না করতেই তাঁরা জানিয়ে দিলেন, ‘দিদি একদম স্টেশনের সামনে চলে যান ৷ ডানদিকে পড়বে ৷’ দোকানে পৌঁছেই দেখলাম ৷ বয়সের ছাপ পড়েছে দোকানের পরতে পরতে ৷ আর কাঁচের শো-কেসের আড়ালে সারি সারি দিয়ে রাখা রসগোল্লা, দানাদার, ক্ষীরকদম্ব... কিন্তু জয়নগরের মোয়া কই ? একটাও পাওয়া যাবে না ? প্রশ্ন শুনে হেসে উঠলেন দোকানের প্রবীণ বিক্রেতা প্রফুল্লবাবু ৷ তাঁর উত্তর, ‘এখন কীভাবে পাবেন ম্যাডাম ? ওটা তো নভেম্বরের আগে কোনওভাবেই বানানো সম্ভব নয় ৷ নলেন গুড় না হলে মোয়া বানানোই যায় না ৷’ ফের প্রশ্ন রাখলাম, ‘তোমরাই বানাও ?’ উত্তর এল, ‘না না ৷ ওটার জন্য আলাদা কারিগর আসেন বাইরে থেকে ৷’ আর গুড় ? জানা গেল, মোয়া তৈরির সময় কিছু দিনের জন্য অনেককে দোকানে কাজে নিয়োগ করা হয় ৷ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা কাজ করেন ৷ খেঁজুর গাছ থেকে মোয়া তৈরি ৷ সবক্ষেত্রেই নতুন লোক নিয়োগ করা হয় ওই নির্দিষ্ট সময়টায় ৷ তাহলে বাকি সময়টায় কী করেন তাঁরা ? সেই প্রশ্নের উত্তর প্রফুল্লবাবুর কাছে ছিল না ৷ তিনি পরামর্শ দিলেন, ‘আপনি বাবু (অশোক ঘোষ)-র কাছে যান ৷ উনিই এই দোকানের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন এই মুহূর্তে ৷’ নাম-ঠিকানা জেনে অশোক ঘোষের বাড়ির উদ্দেশে ফের রওনা দিলাম ৷

শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থুড়ি বুঁচকিবাবুর মিষ্টির দোকান থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে বাড়ি তাঁর ৷ অশোক বাবুর বাড়ি পৌঁছে জানা গেল, বয়স ৭০-র কোঠা পেরিয়ে গিয়েছে ৷ তাই মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জেরে দোকান ছেড়ে আপাতত বাড়িতেই বিশ্রামে রয়েছেন তিনি ৷ কথায় কথায় জানলাম এই দোকানের ইতিহাস ৷ ১৯২৯ সালে দুই বন্ধুর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল এই দোকানটি ৷ এই দোকানটিই জয়নগরের প্রথম প্রথাগত এবং বাণিজ্যিক মোয়ার দোকান ৷ চিরাচরিত মিষ্টি তৈরির প্রথা থেকে বেরিয়ে গিয়ে সামান্য কারিকুরি করে তাঁরা এই মিষ্টিটা তৈরি করেছিলেন নিছকই সময় কাটানোর জন্য ৷

জয়নগরের মোয়া তৈরির নেপথ্যে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন নিত্যগোপাল সরকার ৷ যিনি বাংলাদেশ থেকে এপারে মামাবাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন ৷ এখানে এসে থাকতে গিয়ে পাড়ার ফুটবল খেলার মাঠে আলাপ হয় পূর্ণচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে ৷ দু’জনে একসঙ্গে বড় হয়ে উঠতে থাকেন ৷ তাঁদের আলাপ-আলোচনা, পছন্দ-অপছন্দ সবেতেই ছিল বেশ মিল ৷ সবমিলিয়ে বেশ ভালই কাটছিল দু’জনের ৷ কিন্তু বয়স বাড়তেই রোজগারের চিন্তা মাথায় চেপে বসে ৷ সেই সময়ই স্থানীয় এক মিষ্টিকে ‘কারিকুরি’ করে তৈরি করলেন এক বিশেষ মোয়া ৷ কয়েকদিনের মধ্যেই তা স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকল ৷ এরপর সেটিই আসতে আসতে নাম পরিবর্তন হয়ে হল জয়নগরের মোয়া ৷ অবশ্য, এর আগে এই এলাকায় এমন মিষ্টি তৈরি হত ৷ কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বুঁচকিবাবুর হাত ধরেই এই মোয়ার আসল উত্থান হয়েছে ৷ বলে রাখা ভাল, এই বুঁচকি হল নিত্যগোপাল সরকারের ডাক নাম ৷

সবমিলিয়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও আজ এই মোয়ার চাহিদা তুঙ্গে ৷ জয়নগরে পৌঁছে সকলেই পৌঁছে যান এই মোয়ার দোকানেই ৷ কিন্তু আজ আর সেই আগের মত স্বাদ ধরে রাখা সম্ভব হয়না ৷ কারণ সবেতেই মেশানো হয় ভেজাল ৷ খারাপ লাগে মাঝেমধ্যে ৷ কিন্তু কিছু করার নেই ৷ কথাগুলো বলতে বলতে আফসোস করছিলেন পূর্ণচন্দ্রের ছেলে অশোক ঘোষ ৷ কারণ এই দোকান পরিচালনার দায়িত্বে আপাতত রয়েছেন তিনিই ৷ তিনিই জানালেন, ‘এই তিনটে মাস মোয়া তৈরি করার জন্য বাইরে থেকে লোক আসেন ৷ তাঁরাই তৈরি করেন মোয়া ৷ এছাড়াও গুড় নিয়ে আসা-সহ আরও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ করার জন্য চুক্তিভিক্তিক অনেক লোক নেওয়া হয় মোটা টাকায় ৷’ তাহলে বাকি সময়টাই কী করেন তাঁরা ? অশোকবাবু জানালেন, ‘কেউ চাষবাসের কাজ করেন কিংবা কেউ গাড়ি চালান ৷’ তবে, বেশিরভাগ জনেরই খোঁজ-খবর জানা নেই ৷ স্পষ্ট জানালেন অশোকবাবু ৷

তবে, এ তো গেল মোয়া তৈরি এবং তার ইতিহাস ৷ কিন্তু ২০১৫ সালে জয়নগরের মোয়া জিআই(জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন)-র তকমা পেয়েছিল ৷ সেটার জন্য কি কোনওরকম সুবিধা পান ? প্রশ্নের উত্তরে আফসোসের সুরে অশোকবাবু জানালেন, ‘জিআই দেওয়া হয়েছে ৷ নম্বরও পেয়েছি ৷ কিন্তু আলাদা কোনও সার্টিফিকেট পাইনি ৷ কোনও কাগজপত্রও পাইনি ৷ কোথাও কোনও সদুত্তর মেলেনি ৷’ পাশাপাশি জয়নগরের মোয়া নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করলেন অশোকবাবু ৷ তিনি বললেন, ‘খেঁজুরের গাছই তো নেই ৷ বিলুপ্তির পথে খেঁজুর গাছ ৷ সরকার হয়তো ভিতর ভিতর খেঁজুর গাছ রোপণ করছেন ৷ কিন্তু আমাদের কাছে কোনও খবর নেই ৷ সরকারের কোনওরকম সাহায্য পাইনি এখনও পর্যন্ত ৷’ আগামী ১৯মে-র ভোটে তাই সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ অশোকবাবুর, ‘এই শিল্পটা চাই বাঁচুক ৷ তাই সামান্য যদি সাহায্য করেন ৷’

First published: 10:55:59 PM May 17, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर