• Home
  • »
  • News
  • »
  • south-bengal
  • »
  • ক্যামেরায় বন্দি সময়, ইতিহাসের সাক্ষী বীরভূমের ক্যামেরা দাদু

ক্যামেরায় বন্দি সময়, ইতিহাসের সাক্ষী বীরভূমের ক্যামেরা দাদু

সিউড়ির প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফার বিনয়কুমার গুহ

সিউড়ির প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফার বিনয়কুমার গুহ

স্বাধীনতার আগে কলকাতার এক স্টুডিওতে কাজ শুরু।

  • Share this:

#সিউড়ি: একসময় তিনি দেখতেন ক্যামেরার চোখে। নেগেটিভে বন্দি করেছেন সময়কাল। স্বাধীনতার কিছু সময় আগে। ডার্ক রুমের ঘন আলো-আঁধারিতে ফুটত সংগ্রামের ঘাম-রক্ত। হাসি-কান্নার টেম্পো ধরতেন তিনি। এখন বয়স ৯২। সিউড়ির প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফার বিনয়কুমার গুহ। বিনয়কুমার সিউড়ির বারুইপাড়ার বাসিন্দা। তার ব্যবহৃত পুরনো ক্যামেরা গুলি আজও সযত্নে তুলে রেখেছেন, আর অবসর সময়ে একবার করে সেগুলি বের করে পরিষ্কার করেন। নিজের শিশুর মতো আগনে রাখা ক্যামেরার গুলির গায়ে হাত দিয়ে সেই পুরনো স্মৃতিতে ফিরে যান। বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম বিনয় বাবুর। ১৩ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর মা ভাই নিয়ে সংসার চালানোর জন্য খুলনাতে বিস্কুটের কারখানায় কাজ শুরু, তারপর রেশন দোকান, তারপর চায়ের কম্পানিতে কাজ। স্বাধীনতার আগে, ১৯৪৫ সালে কলকাতার শীতল স্টুডিওতে কাজ শুরু। কাজ না জানায় মালিক ছাড়িয়ে দেন। এরপর মিথ্যে কথা বলে কলকাতারই র‍্যাপিড ফটো সার্ভিস স্টুডিওতে কাজ শুরু।পরে ডার্ক রুমে অবশ্য সব সত্যফাঁস। ওই স্টুডিওর মালিক মিলন বাবু হাতে ধরে কাজ শেখান স্টুডিওর ডার্করুম এর। তখন থেকেই দু একটা ফটো তোলা শুরু ওই স্টুডিওর ক্যামেরা দিয়েই। তখন সালটা ১৯৪৫, কলকাতায় তখন প্রায় সময়ই দোকান বন্ধ থাকতো কার্ফুর জন্য। কিন্তু ফটো স্টুডিওতে কাজ চলত গোপনে কারণ ওই সময় সব থেকে বেশি ডিমান্ড থাকতো নেতাজির স্যালুট দেওয়া ছবির আর ভারতের জাতীয় পতাকার ছবি। ফটো স্টুডিও ডার্ক রুমে ১০০টা নেতাজির ছবি তৈরি করে দিলে দু আনা পাওয়া যেত। কার্ফুর সময় দোকানে কাজ করার জন্য দমদম জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিনয় বাবুকে। স্টুডিওর কাজের রোজগারে পয়সা জমিয়ে একটি প্লেট ক্যামেরা কিনেছিলেন বিনয় বাবু তাই দিয়েই কখনও গঙ্গাসাগর, কখনও দিঘায় যেতেন পর্যটকদের ছবি তুলতে এবং ছবি তুলে হাতে হাতে টাকাও রোজগার করতেন। এইভাবেই ১৯৪৯ সালে বীরভূমের সিউড়িতে তার মাসির বাড়িতে আসেন তিনি। ১৯৪৯ সালে সিউড়ি বাজার পাড়ায় ছোট্ট দোকান। সেই দোকান থেকেই তিনি তার প্রফেশনাল ফটোগ্রাফির কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন সিউড়ির প্রথম প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে। বিয়ে বাড়ি, মৃত্যু বাড়ি, গ্রুপ ছবি এই ধরনের ছবি দিলেই তিনি তার রোজগার করতে থাকেন। কিনে ফেলেন আর্কোপ্লেক্স নামের বিদেশী ক্যামেরা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি-সহ বিধানচন্দ্র রায়, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ছবি তিনি তার ক্যামেরাবন্দি করেন। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে তার বিভিন্ন জায়গায় দাগ পড়তে থাকে ছবি তোলার জন্য। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় সরকারি উন্নয়নের বীরভূম জেলার ছবি তোলার দায়িত্বও দিয়েছিলেন এই বিনয় বাবুকে। ফটো স্টুডিও থাকার জন্য বিভিন্ন ইংরেজ সাহেব ছবি তুলে তার কাছে ডার্ক রুমে আসতেন ছবি প্রিন্ট করার জন্য। ক্যামেরা চলছে। ক্যামেরাগুলো চলেই। সময়টা বদলে যায়। ছবিও বদলায়। ক্যামেরা পুরোন হয়। হয় অ্যান্টিক। ফটোগ্রাফিতে এখন মোবাইল মানুষকে চালনা করে। মোবাইলে যুকে ফটোগ্রাফি বিজনেস আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিনয় বাবুর কাছে থাকা রোলিফ্লেক্স বা রোলিকর্ড এর মতো ক্যামেরা গুলি আজ ইতিহাস। কারন এখন ফটোগ্রাফি জলভাত অটোমেটিকের কাছে। এখনকার যুগে মানুষদের কাছে আর অ্যালবাম বলে কিছু থাকেনা যা থাকে সবটাই থাকে মোবাইলে চিপে জানালেন বিনয় বাবু। আগে সরস্বতী পুজোতে তার দোকানে ছবি তোলার জন্য লাইন পড়তো আর এখন মোবাইলের ক্যামেরা আর বাকিটা ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ। পুরনো অ্যান্টিক ওই ক্যামেরাগুলি আজও তিনি নিজের কাছে আগলে রেখেছেন বহু প্রস্তাব এসেছে ক্যামেরা গুলি বিক্রির কিন্তু যারা তাকে এতদিনের রোজকার দিয়েছে তাদের তিনি ছাড়তে নারাজ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তাই যত্ন করেই নিজের আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছেন ওই ইতিহাস হয়ে যাওয়া ক্যামেরা গুলিকে। এরকম ক্যামেরা আজকের প্রজন্ম দেখলে একটু অবাকই হবে। বিনয় বাবুর নাতনি ক্যামেরাগুলি দেখেছেন কিন্তু অবাক হয়েছেন কারণ এখনকার নতুনের কাছে পুরনোগুলি যে ফিকে তা হাবে ভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। দাদুর সঙ্গে অত্যাধুনিক মোবাইল ক্যামেরায় সেলফি তুলে খুশি। আর নাতির কাছে এই দাদু - ক্যামেরা দাদু হয়েই বেঁচে থাকতে চান আর বাকি কটা দিন।

Supratim Das

Published by:Ananya Chakraborty
First published: