'ওঁরা কেউ এবার ফিরবে না,' ক্রিসমাসের মুখে বো ব্যারাকের বাসিন্দাদের চোখ জোড়া বিষাদ
- Published by:Arka Deb
- news18 bangla
Last Updated:
বো ব্যারাকে ভূমিপুত্ররা ফিরছেন না, ভরসন্ধ্যায় হয়তো বাজবে না ডিজে, দেখা যাবে না হাওয়ামিঠাইওয়ালাকেও।
#কলকাতা: লাল ইটের বাড়িগুলিকে নতুন করে রং করা হয়েছে সদ্য। জানালায়, এক চিলতে দালানের গায়ে লতানে ফুলের মতো জড়িয়ে আছে রঙবাহারি আলো। পাড়ায় ঢোকার মূল রাস্তার এক কোণে খড়ের ঘর করে সাজনো হয়েছে নাজারেথের যিশুর অলৌকিক জন্মদৃশ্য। শিশুরা রঙবাহারি পোশাক পরে রাস্তায় নেমে পড়েছে। আর একটু পরেই সমবেত প্রার্থনা, আর একটু পরেই বড়দিন।
কলকাতা শহরকে ভালোবাসেন এমন যে কাউকে এই বর্ণনাটুকু দিলে চোখ বুজে বলে দেবেন, এ তো বৌবাজার থানার পিছনের গলি, কলকাতার অ্যাংলো পাড়া। ক্রিসমাসের বো ব্য়ারাক। হ্যাঁ, তবে ছবিটা এবারে বদলাচ্ছে। বছরের একমাত্র আনন্দের মরসুমটা ফিকে হয়ে যাওয়ার শীতের ভোরের মতোই কুয়াশা কলকাতার অ্যাংলো পরিবারগুলির চোখে। আট থেকে আশি, প্রাণে খুশির তুফানটাই যেন ভ্যানিস। কেউ অ্যালবাম হাতড়াচ্ছেন, কেউ বা তিরিক্ষি মেজাজে সকলের সঙ্গেই তিক্ত ব্যবহার করে ফেলছেন।
advertisement
এক নং গলিটাতে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল জেফরির সঙ্গে। ৬৪ বছর বয়স, জন্মেছেনই এই সাবেক লাল ইটে ঘেরা পাড়াটায়। এ মহল্লার বুজুর্গদের একজন। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সপ্রশ্ন চোখ চোখ রেখে বলে দিলেন, 'এ বছর ওরা আসছে না। আমি ও এডওয়ার্ড যা হোক করে কাটিয়ে দেবো।'
advertisement
ওঁরা মানে জেফ্রি আর এডওয়ার্ডের আরও ছয় ভাই ও ৫ বোন। কেউ আজ পরিবার নিয়ে থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ বা মার্কিন নাগরিক। ওদের দেখা না দেখায় মেশা জীবনটা গমগম করে ওঠে প্রতি ক্রিসমাসেই। কিছুদিন কাটিয়ে যে যার কাজে ফিরে যান ওরা। এবার তাদের আসা হবে না। জেফ্রিরা আজও স্মার্টফোনের জগৎটা চেনেন না, ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। অপেক্ষার শেষে এই ডিসেম্বরেই ওয়াইনের স্বাদ সুমিষ্ট হয়ে ওঠে প্রিয়জনের স্পর্শে। সেই জেফ্রিই আজ চাইছেন যা হোক করে ইভটা কাটিয়ে দিতে।
advertisement

মনখারাপটা প্রকাশ করতে চান না জর্জিনা, বো ব্যারাকের অন্যতম চেনা মুখ জর্জিনা দেশাই, রাতবিরেতে এই পাড়ার মানুষগুলির আপদে বিপদে যাঁর ডাক পড়ে যখন তখন। আপাতত মেতে রয়েছেন রাস্তা মেরামত তদারকিতে। পিচের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দেয়, জর্জিনা বলেন, আমরা পাড়াটা প্রতিবারের মতোই সাজাবো। তবে চব্বিশ রাতের অনুষ্ঠানটা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি। পরদিন পাড়ার লোকেরা নিজেদের মধ্যে আনন্দ করবেন কিন্তু বাইরের লোককে এবারটা ঢুকতে দিচ্ছি না আমরা।
advertisement
এই জর্জিনার দিদিই বো পাড়ার বিখ্যাত মেরি অ্যান আন্টি। তাঁর তৈরি করা কেক আর ওয়াইনে টানে এই সময়টায় বো পাড়ায় ভিড় জমায় শ'য়ে শ'য়ে লোকজন। ন এবার তো ব্যবসা মার খেল? মেরি আন দরাজ গলায় সকলকে আহ্বান জানান। রিচ প্লমা কেকের গন্ধে ভুরভর করে তাঁর বাড়ির আশপাশ। অ্যান বলছিলেন, "আসলে ক্ষতিটা ব্যবসার নয়, আমি তো পুরোদস্তুর চাকরি করি। আসলে এত লোকজন আসেন, পরিবারটাই যেন বড় হয়ে যায়। সেটাই সারাবছরের সঞ্চয় হয়ে যায়। চেনা মুখগুলি দেখতে এক বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকি। "
advertisement
মেরি অ্যান, বো ব্য়ারাকের চেনা মুখ।মেরি অ্যানের বাড়ি ছেড়ে ঠিক দু'পা এগোলেই পাড়ার একমাত্র দরজির দোকান। তাতে সার দিয়ে সাজানো নতুন বানানো স্যুট প্যান্ট। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, অর্ডার দিয়েও স্যুট নিতে আসেননি অনেকে। আরও একটু এগোতেই, পার্সি নিবাসের উল্টোদিকের বাড়ির এক ভদ্রমহিলার ছবি তুলছিল শহরের কিছু তরুণ ফটোগ্রাফার। তিরিক্ষি মেজাজে তিনি তাঁদের দিকে প্রায় তেড়ে এলেন।
advertisement
বো ব্যারাকের খুদেরা কিন্তু 'কুল'। মনকে কড়া হাতে শাসন করছেন তাঁরা। নিউ নর্মালকে মেনে নিতে শিখেছে স্কুল ছুটির দিনগুলিতে অনলাইন ক্লাসের সৌজন্যে। ক্লাস সেভেনর খুদে সিলভেস্টার সরকার বলছিল, 'অন্য বার চার্চে বেড়াতে যাই। বন্ধুরা বাড়িতে আসে। এবার ভিডিও কলে ক্রিসমাস উইশ করব একে অন্যেকে।' দুগ্গাভাসান স্লোগান তাঁদের গলায়, আসছে বছর আবার হবে।
advertisement
বো ব্যারাকের খুদেরা। নিজস্ব চিত্রসব মিলিয়ে এবারের বো ব্যারাকে ভূমিপুত্ররা ফিরছেন না, ভরসন্ধ্যায় হয়তো বাজবে না ডিজে, দেখা যাবে না হাওয়ামিঠাইওয়ালাকেও। চোখের তারায় জমা অপেক্ষা আর বিষাদ যেন এক বিয়োগান্তক নাটকের শেষ দৃশ্য, ওদিকে বেলা বয়ে যায়, বেলা পড়ে আসে।
কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের সব লেটেস্ট ব্রেকিং নিউজ পাবেন নিউজ 18 বাংলায় ৷ থাকছে দক্ষিণবঙ্গ এবং উত্তরবঙ্গের খবরও ৷ দেখুন ব্রেকিং নিউজ এবং সব গুরুত্বপূর্ণ খবর নিউজ 18 বাংলার লাইভ টিভিতে ৷ এর পাশাপাশি সব খবরের আপডেট পেতে ডাউনলোড করতে পারেন নিউজ 18 বাংলার অ্যাপ ৷ News18 Bangla-কে গুগলে ফলো করতে ক্লিক করুন এখানে ৷
Location :
First Published :
December 15, 2020 8:26 PM IST

