এককালে এই শহর ছিল টোল ও সংস্কৃত চর্চার প্রাণকেন্দ্র। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরজুরে আধুনিক স্কুল-কলেজ হলেও, বালির ঘরে ঘরে আজও বজায় আছে সেই শাস্ত্রীয় আভিজাত্য এবং শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে গঙ্গার ঘাটে কার্তিক পুজো— বালির প্রতিটি উৎসবে আজও সেই পুরনো বনেদিয়ানা আর পাড়ার আড্ডার ছোঁয়া পাওয়া যায়, যা যান্ত্রিক শহরের ভিড়ে অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। নিবেদিতা সেতুর আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশেই যখন শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের স্মৃতিধন্য ঘাটগুলো শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মনে হয় আধুনিকতা আর সাবেকিয়ানা দুই সহোদরের মতো হাত ধরে চলছে।
advertisement
পর্যটকদের কাছে বালির প্রধান আকর্ষণ তার শান্ত গঙ্গা এবং সুপ্রাচীন ঘাটগুলো। বালি ঘাট স্টেশন- এই রেলপথটি পর্যটকদের সরাসরি পৌঁছে দেয় দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির ঠিক ওপারে। পর্যটন শিল্পে রেলের ভূমিকা এখানে অপরিসীম, কারণ কলকাতা বা শহরতলির মানুষ যখনই একটু আধ্যাত্মিক শান্তি খোঁজেন, তাদের প্রথম পছন্দ হয় বালি-বেলুড় বা আদ্যাপীঠ যার মূল মেরুদণ্ডই হল এই রেলপথ।
বালির ভৌগোলিক অবস্থান একে হাওড়া ও কলকাতার এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। বিবেকানন্দ সেতু (বালি ব্রিজ) এবং নিবেদিতা সেতু— এই দুই জোড়া স্তম্ভ এই দুই শহরের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বালি এক অনন্য মাইলফলক। লোহার সমান্তরাল ছন্দে গাঁথা বালি, বালি ঘাট আর রাজচন্দ্রপুর যেন এক জাদুকরী জংশন, যা বাংলার এই প্রাচীন জনপদকে উত্তর ভারতের হিমাচল থেকে দক্ষিণ ভারতের সাগরতীরের সঙ্গে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
শিয়ালদহ এবং হাওড়া— দুই মূল শাখার সংযোগকারী এই স্টেশন এতদিন আধুনিকীকরণের দিক থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, নতুন প্রকল্পে এর ভোল বদলে যাচ্ছে আমূল। বালি স্টেশনে যাত্রীদের যাতায়াত আরও সুগম ও আরামদায়ক করতে একগুচ্ছ নতুন পরিষেবা যুক্ত করা হচ্ছে। স্টেশনের বহিরাবরণ অর্থাৎ ‘ফেসাড’ তৈরি হবে বালির ঐতিহ্যকে মাথায় রেখেই যেখানে আধুনিক কাঠামোর মাঝেও ফুটে উঠবে বাংলার ধ্রুপদী স্থাপত্যের ছোঁয়া। স্টেশনে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে প্রশস্ত রাস্তা, সুসজ্জিত বাগান এবং আলোকসজ্জা, যা ট্রেনের ক্লান্ত যাত্রীদের মনে এক পশলা স্বস্তি এনে দেবে। বিশেষভাবে সক্ষম যাত্রীদের জন্য স্টেশনটিকে সম্পূর্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে, তারই অঙ্গ হিসেবে বয়স্ক এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সুবিধার জন্য থাকছে নতুন লিফট এবং এসকালেটর। এছাড়াও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য থাকছে নিচু উচ্চতার টিকিট কাউন্টার। দৃষ্টিহীন যাত্রীদের চলাচলের সুবিধার জন্য স্টেশনে বসানো হচ্ছে ট্যাকটাইল পাথওয়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থাকছে ব্রেইল ম্যাপ।
স্টেশনের ভিতরে বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ইনফরমেশন ডিসপ্লে বোর্ড, যাতে ট্রেনের গতিবিধি বুঝতে যাত্রীদের কোনও অসুবিধে না হয়। যাত্রীদের জরুরি তথ্যের জন্য থাকছে অত্যাধুনিক হেল্প বুথ। পাশাপাশি প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্টেশনের এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত আধুনিক ফুট ওভার ব্রিজ। স্টেশনের প্রতিটি কোণায় স্পষ্ট সাইনেজ এবং আধুনিক ইন্ডিকেটর বোর্ড লাগানো হচ্ছে, যাতে যাত্রীরা সহজেই গন্তব্য এবং ট্রেনের অবস্থান বুঝতে পারেন। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পুরো স্টেশন চত্বর মুড়ে ফেলা হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। বসানো হচ্ছে উন্নত মানের সাউন্ড সিস্টেম এবং এমার্জেন্সি কল পয়েন্ট। প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়েটিং হলকে সুসজ্জিত করার জন্য থাকছে আরামদায়ক ও টেকসই আসবাবপত্র।
বালি চিরকালই তার সংস্কৃতির জন্য গর্বিত। আধুনিক রেল স্টেশনটি যখন পূর্ণ রূপ পাবে, তখন তা হবে উত্তর কলকাতার প্রবেশপথে এক অনন্য ল্যান্ডমার্ক। ইতিহাসের ধুলোমাখা বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে বালি এখন পা রাখছে স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে। ভারতের রেল ব্যবস্থা বর্তমানে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবং অমৃত ভারত এক্সপ্রেস-এর মতো আধুনিক ট্রেনগুলো সারা দেশে রেল ভ্রমণে নতুন শক্তি সঞ্চার করছে, অন্যদিকে রেলের পরিকাঠামোও দ্রুত গতিতে শক্তিশালী করা হচ্ছে। নতুন রেললাইন স্থাপন, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করা, বিদ্যুতায়নের বিস্তার এবং স্টেশনে উন্নয়নের মতো কাজগুলো মিশন মোডে পরিচালিত হচ্ছে। ভারতীয় রেল ১০০% বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য অর্জনেও নির্ণায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে ১৩০০-রও বেশি রেলওয়ে স্টেশন আধুনিক রূপে সাজানো হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের ১০১টি রেলওয়ে স্টেশনের উন্নয়ন হবে।
