এ ভালবাসা শুধু কি নারী-পুরুষের? না। সেই যে স্লেটের ওপর প্রথম যেদিন ‘অ’ লিখলাম, তারপর থেকেই তো বাগদেবী হয়ে উঠলেন ‘নিভৃতবাসিনী বীণাপানি’ থেকে আপনার লোক। বড় প্রিয় তিনি আমাদের। পড়াশোনা থেকে ছুটি তিনিই দেন বৈ কী! বইয়ের উপর ছড়ানো গাঁদাফুলের পাপড়ি, সে বই ছোঁয়া মানা। পরের দিনের দধিকর্মার আগে পর্যন্ত সেই বইয়ের সঙ্গে আপাত বিচ্ছেদ। আহা! বই জমা রয়েছে না মা সরস্বতীর কাছে! সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেলে যতটা পাপ হয়, তার থেকেও বেশি পাপ কিন্তু ওইদিন বই পড়লে। এই পুজোটাও তো চার-পাঁচদিন হলে পারত! কিংবা আদি অনন্ত কাল। শীত বিদায় নেবে নেবে করেও নেয়নি। আবার শীত পোশাক গায়ে দিতে হবে এমন দুঃসাহসও দেখায়নি। সেদিন ভোরে স্নানে অনীহা নেই। সকাল সকাল স্নান সেরেই পাড়ার মণ্ডপে, কিংবা বাড়িতেই। অঞ্জলী শুরু হত সকাল থেকেই, কিন্তু দেরি করে গেলেও বঞ্চিত করতেন না পুরুত মশাই। ‘জ্ঞান দাও, বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও-এর প্রার্থনা’- সে তো দেবীর কাছে নয়। তিনি যেন অভিভাবক। যতই ভয় দেখানো হোক, দু-এক বার সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেয়ে কিন্তু দেখা হয়ে গিয়েছে। উঁহু! কিস্যু হয় না। কোনও দোকানে সাজানো হলদে ফুল ছাপ কড়কড়ে শাড়ি আর গোটাকয়েক সেফটিপিন দিয়ে আটকানো মায়ের ব্লাউজ। আরেকটু বড় হলে মায়ের শাড়ি তো আছেই। মা দেবেনও বেছে বেছে। এ বিষয়ে ভরসা নেই খুব একটা। সেদিন নিজেকে বালিকা থেকে কিশোরী ভাবলেও কোনও দোষ নেই। শ্যাম্পু করা চুল উড়িয়ে খিলখিলে হাসি। কোনও রকম প্রসাদ খেয়েই দৌড়তে হবে ইস্কুলে। বাড়ির ঠাকুর তো হল। কিন্তু বিদ্যার দেবী তো বিদ্যালয়েও আছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে না? এই যে এত তোড়জোড় সব তো তাঁর মন জোগানোর জন্যই। কে পাবে তাঁর মন? ক্লাস নাইন বি, নাকি ক্লাস এইট সি? অন্যের আলপনা নকল করতে দেখলে তিনি অলক্ষ্যে বসে সব লক্ষ্য করবেন কিন্তু। শুধু আলপনা নয়, চলত চাঁদা কাটার প্রতিযোগিতাও। হাতে ছাপা বিলও থাকত না কয়েকজনের। বড়রা বলতেন,’পড়াশোনার বালাই নেই, চাঁদা তুলতে বেরিয়েছে।’ খবরের কাগজের মুড়ে ভ্যানে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও চুলটানাটানি। ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী।’ তারপর সারারাত পাহারা। একা রাখা তো যাবে না তাঁকে। সেই সুযোগেই সরস্বতী বিদ্যেবতীর পাশে টুক করে রেখে দেওয়া খোলা চিঠি। ‘একটু দয়া কর মাগো বিদ্যে যেন হয়।’ পরের বার থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া হবে। প্রতিবছর এই একই প্রতিশ্রুতি। উনি বোধহয় সবই জানতেন আর এই অবোধ প্রাণগুলোর কাণ্ড দেখে মুচকি হাসতেন। তাদের শৈশব থেকে কৈশোরের যাত্রাও তো তাঁরই চোখে দেখা। স্লেটে খড়ি দিয়ে লেখা বর্ণমালা কবে কীভাবে বদলে গেল প্রেমপত্রে। একদিকে পুরুতমশাই মন্ত্র পড়ছেন, অন্যদিকে ঘটে স্বস্তিক আঁকতে আঁকতে আড়চোখে ‘তাকে’ একবার দেখে নেওয়া। সরস্বতীপুজোর সকালগুলো ছিল ভারী অদ্ভুত। কী যে মিশে থাকত বাতাসে। সেই মিঠে রোদ, সেই ঝাঁকে ঝাঁকে হলুদ শাড়ির কিশোরীরা, সেই প্রসাদের শালপাতার ঠোঙা হাতে নিয়ে অঞ্জলি দিয়ে ফেরা, প্যান্ডেলের পিছনে নিখুঁত ভাবে চলছে বাঁধাকপি কাটা কিংবা আলুর গায়ে ফুটো করে নুন হলুদ মাখানো। সারা বছর যেই চোখ বড় বড় দিদিমণিদের দেখে সিঁটিয়ে থাকতাম, সরস্বতীপুজোর দিন তাঁরাই অন্য সাজে। বন্ধুর মতো আলাপচারিতা। বেঞ্চ পেতে খিচুড়ি খাওয়া, আলু ভাঙতে গিয়ে তা বাউন্স খেয়ে চলে গেল উল্টোদিকের পাতে। তারপরেই সেই মুহূর্ত। দুরুদুরু বুক। মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে তখন ‘বেণীমাধব’দের ভিড়। মনে মনে তো কতজনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেই যেত। এর মধ্যে আবার যদি একটু ‘বসন্ত বহিল সখি’, দখিনা বাতাসে উড়ে গেল আঁচল, কিংবা একগোছা চুল। আহা! ‘ও যে মানে না মানা’। রাংতা দিয়ে বানানো শিকলির সঙ্গেই কখন যেন গাঁথা হয়ে যেত আরেকটা বন্ধন। বসন্তের বন্ধন। বসন্ত সব অর্থেই বড় ছোঁয়াচে। এ পুজো বসন্তেরই বধূবরণ।
advertisement
‘গতানুগতিক দিন. গতানুগতিক রাত আসে!’ মফঃস্বলের রাস্তায় সমান্তরালে হাঁটে দুটো সাইকেল… মধুর ধ্বনি বাজে… দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়রে দেবতা…
