গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, শারীরিক ও মানসিক কার্যকারিতা সর্বোত্তম পর্যায়ে রাখার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা মানসম্মত ঘুমের প্রয়োজন হয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে, শক্তির ভাণ্ডার পূর্ণ করে এবং এমন সব হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে যা মানুষের মেজাজ ও মানসিক চাপের ওপর প্রভাব ফেলে। যখন ঘুমের এই পুনরুদ্ধারকারী চক্রটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তখন এর প্রভাব কেবল সকালে ক্লান্ত বোধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা আরও গভীর মানসিক চ্যালেঞ্জের দিকেও মোড় নিতে পারে।
advertisement
কিডনির সমস্যা ফুটে ওঠে পায়ে! এই ৫ লক্ষণ সম্পর্কে এখনই ‘সজাগ’ হন, আপনার শরীরেও দেখা দিচ্ছে কি?
‘বেঁচে থাকলে রেহাই নেই’, নেতানিয়াহুকে ‘শিশু হত্যাকারী’ বলে হুঁশিয়ারি ইরানের বিপ্লবী গার্ডের!
ঘুমের অভাব কি উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে?
ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক
কানপুরের অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের নিউরোলজির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. জুবায়ের সরকার-এর মতে, ধারাবাহিকভাবে ঘুমের অভাব মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নিতে এবং মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে স্থিতিশীল করতে বাধা দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “যখন কোনও ব্যক্তি নিয়মিত কম ঘুমান, তখন মস্তিষ্ক বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায় না। এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার মস্তিষ্কের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, যার ফলে ব্যক্তিরা এমনকি ছোটখাটো বিষয় নিয়েও অত্যধিক উদ্বেগ বা মানসিক চাপ অনুভব করার ঝুঁকিতে পড়ে যান।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের মেজাজ-নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষাদ বা খিটখিটে মেজাজের মতো লক্ষণগুলোর সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে সব ব্যক্তি আগে থেকেই উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটে; এর ফলে এমন একটি চক্র তৈরি হয় যেখানে অপর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক কষ্ট একে অপরকে আরও তীব্র করে তোলে।
ঘুমের বঞ্চনায় ডিজিটাল অভ্যাসের ভূমিকা
আধুনিক প্রযুক্তি হল আরেকটি উপাদান যা ঘুমের গুণমানকে প্রভাবিত করে। গোরখপুরের রিজেন্সি হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. বিজয় কুমার শর্মা উল্লেখ করেন যে, ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা বা স্ক্রিন ব্যবহার করা শরীরের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
তিনি বলেন, “স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপ থেকে নির্গত ‘নীল আলো’ (Blue light) ঘুমের নিয়ন্ত্রক হরমোনগুলোর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। এর ফলে মানুষের ঘুম আসতে বেশি সময় লাগে এবং ঘুমের সামগ্রিক গুণমানও হ্রাস পায়।”
ঘুমের বঞ্চনার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—অবিরাম ক্লান্তি, মনোযোগ দিতে অসুবিধা এবং মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন। যখন এই লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য অব্যাহত থাকে, তখন সেগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ঘুমের অভাব কীভাবে শরীরে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে
ঘুমের অভাব শরীরের শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক মানসিক চাপকেও বাড়িয়ে তোলে। বেঙ্গালুরুর স্পর্শ হাসপাতালের (SPARSH Hospital) ইএনটি (ENT) এবং হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও প্রধান ডা. দিব্যা বাদানিয়ুর ব্যাখ্যা করেন যে, দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব শরীরের মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস রেসপন্স’কে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি বলেন, “যখন দীর্ঘ সময় ধরে ঘুম অপর্যাপ্ত থাকে, তখন শরীরে মানসিক চাপের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উদ্বেগ এবং মন খারাপের মতো লক্ষণগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে; আর ঠিক এই কারণেই একটি সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, শরীরে মানসিক চাপের হরমোনের আধিক্য এবং মানসিক ক্লান্তি মানুষের মানসিক সহনশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যার ফলে দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ চাপ সামলানো তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘুমের গুণমান উন্নত করার কিছু সহজ অভ্যাস
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে, ঘুমের গুণমান উন্নয়নের বিষয়টি প্রায়শই জীবনযাত্রার কিছু ছোটখাটো পরিবর্তনের মাধ্যমেই শুরু হয়। ঘুমের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলা—অর্থাৎ প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠা— শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈব-ঘড়িকে (biological clock) নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।
ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার সময় কমিয়ে আনাও ঘুমের গুণমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। এছাড়া অন্যান্য সহায়ক অভ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে রাতে হালকা খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং ঘুমানোর জন্য এমন একটি শান্ত ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা যেখানে কোনও ধরনের ব্যাঘাত ঘটার সুযোগ নেই।
যদি ঘুমের সমস্যা দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে, তবে এর নেপথ্যের মূল কারণগুলো শনাক্ত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা প্রতিরোধ করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
উন্নত মানসিক সুস্থতার জন্য ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া
ঘুমকে কেবল একটি ঐচ্ছিক অবসর সময় হিসেবে না দেখে বরং স্বাস্থ্যের একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে, স্মৃতিশক্তি জোরদার করে এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করে; পাশাপাশি এটি শরীরকে দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ আরও কার্যকরভাবে সামলাতে সাহায্য করে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা যেহেতু ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই নিয়মিত ও গভীর ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে এমন একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, যা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ তার মন ও শরীর— উভয়কেই সুরক্ষিত রাখতে পারে।
