মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর জেরেই বাংলাদেশে জ্বালানির ঘাটতি তীব্র হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের বার্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত থেকে ডিজেল সরবরাহ শুরু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকাভিত্তিক ‘দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, অসমের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে এই ডিজেল দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছবে। উল্লেখ্য, এই পাইপলাইনটির উদ্বোধন ২০২৩ সালের মার্চ মাসে করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই অবকাঠামোর মাধ্যমেই এখন সরাসরি ডিজেল পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
advertisement
বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মতে, এই সরবরাহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যবস্থার উপর তৈরি হওয়া চাপ কিছুটা হলেও কমাতে সাহায্য করবে।
তবে গত কয়েক বছরে ভারত ও বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতার সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৪ সালের অগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে হওয়া একাধিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে। কিছু ক্ষেত্রে সেগুলি আংশিকভাবে স্থগিতও করা হয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ওই চুক্তিগুলির শর্ত বাংলাদেশের পক্ষে খুব বেশি অনুকূল ছিল না।
এর ফলে ঝাড়খণ্ডে আদানি গোষ্ঠীর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যায় এবং কয়লা সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি গ্যাস ও এলএনজি সংক্রান্ত কয়েকটি সীমান্তপারের প্রকল্পও ধীরগতিতে এগোতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের নতুন করে ডিজেল পাঠানোকে দুই দেশের জ্বালানি সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ৫,০০০ টন ডিজেল পাঠানো হচ্ছে। পাইপলাইন চালু হওয়ার আগে এই ধরনের জ্বালানি পরিবহণের জন্য মূলত রেল ট্যাঙ্কারের উপরই নির্ভর করতে হত।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, ভারত প্রতি বছর মোট ১,৮০,০০০ টন ডিজেল বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। বিপিসি চেয়ারম্যান মুহাম্মদ রেজানুর রহমান সংবাদসংস্থা এএনআই-কে জানিয়েছেন, এই ৫,০০০ টন ডিজেল সেই বার্ষিক চুক্তিরই অংশ। তিনি আরও জানান, আগামী ছয় মাসে অন্তত ৯০,০০০ টন ডিজেল সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।
বিপিসির কমার্স অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে পাইপলাইনে ডিজেল পাম্প করা শুরু হয়েছে। প্রায় ৫,০০০ মেট্রিক টন ডিজেল পৌঁছতে প্রায় ৪৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১৩ টন হারে তেল পাঠানো হচ্ছে, ফলে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই পুরো সরবরাহ সম্পূর্ণ হওয়ার কথা।
এই আন্তর্দেশীয় পাইপলাইন এখন দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবকাঠামো হয়ে উঠেছে। এর ফলে জ্বালানি পরিবহণে সময় ও খরচ—দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের বড় কারণ বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন। মার্কিন-ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে চাপ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহণ পথ।
বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে এবং এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও দেশে দ্রুত জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ইতিমধ্যেই দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সরকার জ্বালানি বিক্রিতেও কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অনেক জায়গায় মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লিটার এবং গাড়ির জন্য ৪০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি বিক্রির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি বড় চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে। বিশেষ করে ঝাড়খণ্ডে আদানি গোষ্ঠীর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১,৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, ওই চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে বেশি দাম দিতে হচ্ছিল।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া থাকার কারণে আদানি গোষ্ঠী বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক করে দেয়। পরে ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ বকেয়া পরিশোধ শুরু করলে আবার পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয়।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সীমান্তপারের আরও কয়েকটি জ্বালানি প্রকল্প—যেমন নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ সহযোগিতা বা এলএনজি প্রকল্প—ধীরগতিতে এগোয়।
তবে বর্তমানে ঢাকায় তারিক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক আবার ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই ডিজেল সরবরাহকে জ্বালানি সহযোগিতা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান ও অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশ এখনও জ্বালানি ক্ষেত্রে ভারতের উপরই উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
