৮০ বছর পরে ফের রাস্তায় নামবে নেতাজির ‘ওয়ান্ডারার’

Jan 16, 2017 04:46 PM IST | Updated on: Jan 16, 2017 05:11 PM IST

 #কলকাতা: সালটা ১৯৪১, কলকাতার রাস্তায় গ্যাসবাতির টিমটিমে আলো ৷ চারিদিকের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছে বুক কাঁপানো ব্রিটিশ বুটের শব্দ ৷ ঠিক তখনই রাতের অন্ধকারের বুক চিরে এলগিন রোড ধরে ছুটে চলেছে একটি টারকোয়েজ ব্লু রঙের ওয়ান্ডারার W24 লিমো ৷ গাড়ির ব্যাকসিটে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ৷

জার্মানিতে তৈরি ওয়ান্ডারার W24 লিমো ৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈপ্লবিক সফরের শুরুটা এই গাড়ি থেকেই হয়েছিল ৷ ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে নেতাজির অন্তর্ধানে জার্মান কোম্পানি নির্মিত এই ওয়ান্ডারার গাড়িটির অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল  ৷

৮০ বছর পরে ফের রাস্তায় নামবে নেতাজির ‘ওয়ান্ডারার’

১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি মধ্যরাতে প্রহরারত ব্রিটিশ পুলিশের নাকের তলা দিয়ে গোপনে এই গাড়িতে চেপেই এলগিন রোডের বাড়ি থেকে বিহারের গোমো রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছেছিল নেতাজি ৷ সময় লেগেছিল পুরো একদিন ৷

আশি বছর বাদে বিস্মৃতির ধুলো ঝেড়ে আবারও মহানগরের রাস্তায় দৌড়বে নেতাজির প্রিয় টারকুয়িজ ব্লু ওয়ান্ডারার ৷ শুধু তাই নয় এবার নেতাজির সেই অ্যাডভেঞ্চারের অংশ হতে পারবেন সাধারণ মানুষও ৷

তবে প্রত্যাবর্তনটা খুব একটা সহজ ছিল না ৷ কলকাতার ১০ জন দক্ষ মেকানিকসের প্রচেষ্টায় পুরনো লজঝড়ে গাড়িটি এখন স্বমহিমায় ফিরেছে ৷ ওয়ান্ডারার নির্মাতা অটো ইউনিয়ন এখন অডি গাড়ি তৈরি করে ৷ সেই অডির নির্মাতা ও বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল টিমের গত বছরের জুলাই মাসে এই গাড়িটিকে পরীক্ষা করেন ৷ এরপরই শুরু হয় নেতাজির প্রিয় বাহনের মেকওভার ৷

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গাড়ি, তা জানতে ফিরে যেতে হবে ৮০ বছর আগে ৷ এই গাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নেতাজি ও তাঁর পরিবারের অনেক স্মৃতি, অনেক অলিখিত গল্প ৷ ১৯৩৭-এ অনেক শখ করে গাড়িটি কেনেন সুভাষ চন্দ্র বোসের বড় দাদা শরৎ চন্দ্র বোস ৷ এর চার বছর পর তিনি ওয়ান্ডারার W24 লিমো গাড়িটি নিজের ছেলে শিশির কুমার বোসকে দিয়ে দেন ৷ স্বাধীনতা অর্জনের এই যজ্ঞের একজন সৈনিক হিসেবে নিজের হাতে ভাইপো শিশিরকে তৈরি করেছিলেন নেতাজি ৷ ১৯ বছরের শিশিরই ব্রিটিশ পুলিশকে ধোকা দিয়ে নেতাজিকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে উদ্ধার করে ওয়ান্ডারার W24-এ চাপিয়ে বিহারের গোমো রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিলেন ৷ আজ থেকে ৭৬ বছর আগের সে রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ২৩-২৪ ঘণ্টা নিজে গাড়িটি চালিয়ে কাকা সুভাষ চন্দ্র বোসকে নিজের লক্ষ্য পূরণের দিকে আরও খানিকটা এগিয়ে দিয়েছিল শিশির ৷

বিহারের গোমো স্টেশন থেকে দিল্লি-কালকা মেল ধরেন সুভাষ ৷ সেখান থেকে পেশোয়ার, কাবুল হয়ে মস্কো পেরিয়ে বার্লিনে পৌঁছান তিনি ৷ তার পর কি হল তা সবাই জানে ৷

১৯৩৭-এ কেনা ১.৮ লিটার, চার দরজাওয়ালা লিমো গাড়িটির দাম পড়েছিল ৪,৬৮০ টাকা ৷ নেতাজির পলায়নের পরও পঞ্চাশের দশকের শেষের দিক অবধি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়েছে এই গাড়িটি ৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, সে সময় গাড়িটির রঙ ছিল টারকোয়েজ ব্লু ৷

‘১৯৫৫ সালে আমার বিয়ের পর পর প্রায়ই আমরা ওই গাড়িটা চেপে ঘুরতে বেরোতাম ৷ প্রায় ১৮ বছরের পুরনো লিমো গাড়িটার রঙ তখন একদম ফিকে হয়ে গিয়েছে ৷ তখন আমার আবদারেরই ওয়ান্ডারার W24-এর গায়ে কালো রঙের নতুন প্রলেপ পড়ে ৷’ গাড়িটির কথা বলতে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েন নেতাজির প্রিয় ভাইপো ডঃ শিশির কুমার বোসের স্ত্রী কৃষ্ণা বসু ৷ শুধু স্বামীর সঙ্গেই নয়, পুত্র সৌগতর সঙ্গেও এই গাড়ির ভালবাসার যোগ সূত্র রয়েছে ৷

‘জানেন, কতবার হয়েছে ছেলে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাকে নিয়ে কাছে পিঠে ঘুরতে বেরিয়েছে, আর রাস্তায় খানিকটা গিয়েই গাড়ি বন্ধ ৷ তখন এই বুড়ো গাড়িকে ঠেলে নিয়ে রাসবিহারির ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে ফিরতে হয়েছে ৷’ হাসতে হাসতে লিমো গাড়ির এমন অনেক গল্প নিউজ১৮-এর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন নেতাজির বউমা ৷

তবে শেষবার এই গাড়ি রাস্তায় দৌড়েছিল এক জাপানি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য ৷ ১৯৭৮ সালে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের উপর ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য কলকাতায় এসেছিল জাপানি দল ৷ ঘটনার পুনর্নিমানের জন্য ফের নেতাজিকে সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করতে গাড়ির চালকের আসনে বসেন শিশির কুমার বোস ৷ তফাৎ শুধু গাড়ির ব্যাকসিটে ছিলেন না নেতাজি, আর সামনের চালকের আসনে বসা কিশোর তখন ৫৫-এর প্রৌঢ় ৷

গাড়িটি এতদিন এলগিন রোডের পৈতৃক বাড়িতে ডঃ শিশির বোসের তৈরি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোতে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সংরক্ষিত ছিল ৷ সেখানেই রাখা ছিল নেতাজির পাঠানো চিঠিও ৷ এবার এই ওয়ান্ডারার W24 লিমো জায়গা নেবে নেতাজি ভবনে ৷ আগামী ১৮ জানুয়ারি নতুন রূপে এটির উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ৷ শুধু তাই নয়, গাড়িটির স্টিয়ারিং হুইলেরও দখল নেবেন তিনি ৷

৩৯ বছরেরও বেশি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা ৮০ বছরেরও বেশি পুরনো লিমো গাড়িটিকে বহু যত্ন নিয়ে আবার পুরনো রূপে ফিরিয়ে দিয়েছেন অডি কর্তৃপক্ষ ৷ ড্যাশ বোর্ড, আপ হোলস্ট্রে, চামড়ার সিট, হুইল কভার, কাঠের ফ্রেমে ফিরিয়ে এনেছেন ১৯৪১-এর রূপ-গুণ ৷

ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি দিতে অভিনব পরিকল্পনা নিয়েছেন নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো কর্তৃপক্ষ ৷ নেতাজি ভবনে আসা দর্শকেরা গাড়িটিতে চেপে ভবনের অন্দরে নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুরতেও পারবেন ৷

আবার ছুটবে ওয়ান্ডারার W24 লিমো ৷ যেমন করে চাঁদের আলোয় ভরা এক রাতে ১৯ বছরের এক কিশোরের নির্দেশে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রকে বোসকে নিয়ে নিজের মিশন সম্পূর্ণ করতে দৌড়েছিল সে ৷

স্পেশ্যাল রিপোর্ট:-  সৌগত মুখোপাধ্যায়

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES