হেরোইনের নেশায় মগ্ন ‘নেশা গ্রাম’

হেরোইনের নেশায় মগ্ন ‘নেশা গ্রাম’

ওই গ্রামে ঢুকলে বেশিরভাগ যুবকের হাতের আঙ্গুল ,ঠোঁট আর সামনের দাঁত গুলো দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়, ওরা হেরোইনের নেশা করে।

  • Share this:

Shanku Santra

#নদিয়া: ছেলে কিংবা মেয়েকে বিয়ে দেবেন ,ওই গ্রামে? ভেবে দেখুন ,ছেলে নেশা করে না তো ? অথবা ওই বাড়ির মেয়ে নেবেন ? পরিবারে ক’জন নেশা করে ? একগাদা প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন আপনি। এত প্রশ্ন কেন ? উত্তর একটাই ,ওই গ্রামে ৬০ শতাংশ যুবক মাদকের নেশা করে।গ্রামের নাম কাঁচকুলি। নদিয়া জেলার নাকাশিপাড়া থানার অন্তর্গত। ওই গ্রামে বিখ্যাত নাম বাচ্চা সাধু। বাচ্চা সাধু আগে লালগোলা কিংবা লোকাল ট্রেনে একতারা নিয়ে বাউল গান গাইতো। এখন আর সে গান গাইতে বের হয়না। কোটি কোটি টাকার মালিক। তার কাজ যুবকদের ধরে ধরে হিরোইনের নেশা করানো। তারপর তাদেরকে দিয়ে হেরোইনের পুড়িয়া সাপ্লাই করা।

ওই গ্রামে ঢুকলে বেশিরভাগ যুবকের হাতের আঙ্গুল ,ঠোঁট আর সামনের দাঁত গুলো দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়, ওরা হেরোইনের নেশা করে। এই নিয়ে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ থাকলেও ,বাচ্চা সাধুর সঙ্গে কেউ পেরে ওঠে না। মাসে অন্ততপক্ষে দুই থেকে তিনবার বাচ্চা সাধুকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ । তারপর আবার ছাড়া পেয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। চালাতে থাকে তার হেরোইনের ব্যবসা। কাচকুলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দেখা এক গ্রামবাসীর সঙ্গে। তিনি জানালেন গ্রামের ভয়ঙ্কর অবস্থা। সঙ্গে আফসোস করলেন প্রশাসনিক শিথিলতা নিয়ে। গ্রামের বেশ কিছু মানুষ তারা একসঙ্গে বহুবার থানায় জানিয়েছে কিংবা প্রশাসনিক ওপর মহলে জানিয়েছেন, তাতে কোনও লাভ হয়নি বরং প্রতিদিন হেরোইনের নেশা সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়ছে। তিনি আরও বললেন- ‘‘ এই গ্রামে এখন কেউ মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইছেন না। এমনকী, এই গ্রামের মেয়েদের বাইরে বিয়ে দিতে গেলে, অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মেয়ের বাবা-মাকে।’’

গ্রামে রাস্তার পাশে একটি টিনের বাড়ি।এক জন দেখিয়ে বলল এটাই বাচ্চা সাধুর আস্তানা।এখন থেকেই সম্পূর্ণ চক্রটা চালায় বাচ্চা সাধু। যারা নেশা করে তাদেরকে দিয়ে ,এই বাচ্চা সাধু আস্ত উঠতি বয়সের যুবকদের ডেকে নিয়ে আসে। অন্যান্য নেশাগ্রস্থদের সঙ্গে বসিয়ে, প্রথমটাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হিরোইনের নেশা করায়। দেখা যায় ওই যুবক ক্ষেত মজুরের কাজ করে দিনের শেষে ৩০০ টাকা রোজগার করে। বাড়িতে কমপক্ষে ২০০টাকা দিতেই হয়। বাকি ১০০ টাকার নেশা করে শুরু। একটি হেরোইনের পুড়িয়ার দাম ১৩০ টাকা। প্রথমটাতে যুবকটির ১০০ টাকা খরচা করলেই নেশা হয়ে যায়। এই ভাবে দিনের পর দিন নেশা করতে করতে সাত থেকে দশ দিন পরে তার প্রয়োজন হয়, দিনে কমপক্ষে তিন থেকে চারটি পুড়িয়া অর্থাৎ ৫২০ টাকা।

অত টাকা রোজগার নেই ,কিন্তু নেশা করতেই হবে। তখন সেই টাকা জোগাড়ের জন্য, এই নেশাগ্রস্ত যুবক চুরি করতে নামে। যার ফলে বেথুয়া ডহরি, ধর্মদা এইসব এলাকাতে সাইকেল, মোটর বাইক কিংবা বাড়িতে চুরি বাড়ছে দিনের পর দিন।এই ভাবে প্রতিটি যুবক জড়িয়ে পড়ছে হেরোইনের নেশাতে।

হেরোইনের নেশা এতটাই ভয়ানক যে ,যখন নেশা ওঠে সেই সময় যদি হেরোইন না পায়, তাহলে এরা ভয়ঙ্কর হয়ে পড়ে । তখন যতই ভয়ঙ্কর অপরাধ হোক, না কেন এরা করে ফেলে। তা না করতে পারলে নেশাগ্রস্তরা আত্মহত্যা করে। ইতিমধ্যে কাচকুলি গ্রামে লালু শেখ ও কালো শেখ নামে দুজন নেশার টাকা না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে।এই নেশা প্রথমটা একটি রাংতার তলায় আগুন দিয়ে একটা পাইপ দিয়ে এরা হেরোইনের ধোঁয়াটা টানে। বেশ কিছু দিন এইরকম নেশা করার পর ,এরা প্রত্যেকেই ইন্টার ভেনাস ইঞ্জেকশন নিতে শুরু করে। হেরোইন জলের সঙ্গে ফুঁটিয়ে ,ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের ধমনীতে নিজেই কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে ইঞ্জেকশন নেয়। ওই গ্রামে গেলে এরকম বহু ছেলেকে দেখা যাবে, যারা হাতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনও দেখা যায় ,তারা অনুরোধ করছে সরাসরি 'আমাকে একটু ইঞ্জেকশন দিয়ে দেবে? '

1800_IMG-20191228-WA0041

শুধু এই কাঁচকুলি গ্রাম নয় ।পাশে রয়েছে চন্দনপুর গ্রাম ।সেখানেও একই অবস্থা। সেই গ্রামে মেয়ে কিংবা ছেলে বিয়ে দিতে গেলে, সহজে কেউ রাজি হয় না।এই গ্রামগুলিতে যারা শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন তাদের প্রতিদিনের জীবন যাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিকভাবে বেশ কয়েকবার ধরপাকড় করে পদক্ষেপ নিলেও দেখা গেছে, এই নেশাগ্রস্থরা এলাকার বাইরে থেকে হিরোইন কিনে এনে নেশা করে । আর না পেলে রাস্তাঘাটে ভয়ংকর ধরনের অপরাধ ঘটায়।তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, অনেকেই বলেন প্রতিদিন নতুন নেশাগ্রস্ত তৈরি হচ্ছে, এই গ্রামে ।পুলিশ জানে কিন্তু সেটা নিয়ে কোন পদক্ষেপ হয়নি আজও পর্যন্ত। যারা নেশা করে তারা প্রত্যেকেই শ্রমিক শ্রেণীর যুবক। ১৬ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর বয়সীরা বেশি এই মাদক নেশাতে জড়িয়ে।প্রথমটা পরিবারের কেউ জানতে পারে না।যখন জানতে পারে তখন আর কিছু করার থাকে না।আস্তে আস্তে সবাই পরিবার থেকে ছিন্ন হতে শুরু করে। যদি এই রকম চলতে থাকে, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি এই গ্রাম গুলি পুরুষ শুন্য হয়ে পড়বে ৷ এমনটাই ধারণা স্থানীয় এক চিকিৎসকের।

First published: 09:14:12 AM Dec 29, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर