• Home
  • »
  • News
  • »
  • south-bengal
  • »
  • সাক্ষাৎ সরস্বতী! আমফান বিধ্বস্ত অঞ্চলে ছোটদের পড়াচ্ছেন এই তিনকন্যা

সাক্ষাৎ সরস্বতী! আমফান বিধ্বস্ত অঞ্চলে ছোটদের পড়াচ্ছেন এই তিনকন্যা

প্রবল দুর্যোগের দিনেও শিশুদের পাঠ দিচ্ছেন অপর্ণা মাইতি।

প্রবল দুর্যোগের দিনেও শিশুদের পাঠ দিচ্ছেন অপর্ণা মাইতি।

আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনের তিন কন্যা জানেন, একদিন এই ছেলেমেয়েরাই গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে, ঝড়ের চেয়েও দ্রুত বেগে ছড়াবে ওঁদের নাম।

  • Share this:

#সুন্দরবন: রাস্তার ধারের বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে রয়েছে। শিকড় সমেত উপড়ে যাওয়া গাছের ডাল ভেঙে পড়ে রয়েছে কারও বাড়ির চালে। কবে বিদ্যুৎ আসবে, কবে ফের ফোনে যোগাযোগ করা যাবে, কেউ জানেন না। কাদা মাটি মাখা বাড়ির দাওয়ায় বাচ্চাদের বইগুলো জলে ভিজে পড়ে আছে। তবু হাজার প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে অদম্য জেদে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের তিন কন্যা। লক্ষ্য একটাই, কিছুতেই  বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না সন্তানের লেখাপড়া।

সুস্মিতা দাস। স্বামী কেরালায় কাজ করেন। রাজ্যে যখন ট্রলার জলে নামে না, তখন তাঁর স্বামী জল মাপতে যান কেরালায়। দু'টো বাড়তি পয়সা হাতে আসবে বলে। ফিরে আসার সময় হয়ে এলেও, লকডাউনের জন্যে আর ফেরা হয়নি। তাই দুই ছেলে সুজয় আর সায়নকে নিয়ে একাই থাকেন সুস্মিতা। রেডিওতে ঝড় আসবে শুনে দু'কিলোমিটার দুরের স্কুলে গিয়ে আশ্র‍য় নিয়েছিল তাঁরা। একলা ছেড়ে গিয়েছিল কাঁচা বাড়িটাকে।  শুধু প্রয়োজনীয় কাগজগুলি নিয়েই রওনা হয়েছিল। ছেড়ে গিয়েছিলেন।  ঝড় থামলে ফিরে এসে দেখেছেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সাধের বাড়িটা মাটিতে প্রায় শুয়ে পড়েছে। দুই ছেলের স্কুল থেকে পাওয়া বই আর খাতাগুলো ভিজে গিয়েছে। মুড়িগঙ্গার পাড়ে রোদ্দুর এলে শুকিয়ে নিয়েছেন বই-খাতা। আর যাই হোক, ছেলেদের পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না, সেই জেদেই ঘরে বিদ্যুৎ না এলেও ভিজে দাওয়ায় বসে পড়াশোনা করাচ্ছেন সুস্মিতা।

সুস্মিতার অদম্য জেদ হার মানায় আমফানকেও। সুস্মিতার অদম্য জেদ হার মানায় আমফানকেও।

"আমার পড়াশোনা কম। কিন্তু আমার ছেলেদুটটো যেন ভালো করে পড়াশোনা শেখে। আমি টিউশনি করি। তাই পড়ানো আমার অভ্যাস। তাই কষ্ট হলেও আমি পড়ানো বন্ধ করিনি।" এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন সুস্মিতা।

পড়াশোনা যে বন্ধ করা যায় না সেটা বুঝেছিল রাজিয়াও। তাই সুন্দরবন বালিকা বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজে ভর্তি হবার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিল সে। কন্যাশ্রীর টাকা পেয়েছিল। ব্যাস ওইটুকুই। বাড়িতে সংসার চালানো কঠিন আগে খেয়ে বাঁচুক, পরে হবে বিদ্যা, অগত্যা বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে।  সেই রাজিয়া এখন আলো দেখাচ্ছেন গ্রামের শিশুদের। ঝড়ে সবার বাড়িতে ফাটল। চাল উড়েছে। ত্রাণের ত্রিপল ভরসা। কিন্ত পড়াশোনা শেখাতে ভরসা সেই রাজিয়া।

রাজিয়াই আলো দেখাচ্ছেন গ্রামের শিশুদের। রাজিয়াই আলো দেখাচ্ছেন গ্রামের শিশুদের।

"আসলে স্কুল বন্ধ। বাচ্চাগুলোকে না পড়ালে চলবে কি করে? তাই না আমি পড়াতে বসেছি। রাতে আলো নেই। কবে আসবে কেউ জানেনা। তাই না আমি ওদের দিনের বেলা পড়াচ্ছি।  রোজ পড়লে মনে থাকবে। টুম্পা, চন্দন, নিলয়ের সামনে বসে কথা গুলো বলে যাচ্ছিল রাজিয়া।"

পড়াশোনা না শিখলে ঝড়ের থেকেও বড় বিপদ আসবে বলে মনে করে অপর্ণা।অপর্ণা মাইতি, সোনারপুরে স্কুল, কলেজ শেষ করে এখন কাকদ্বীপের গৃহবধূ। বাড়ি ভেঙে গেছে। সেখানেই বাড়ির দাওয়ায় বসে প্রতিদিন সকাল থেকে চলছে পড়ানোর কাজ। এক দিকে ভাঙা টালি সরানোর কাজ চলছে আর অন্য দিকে চলছে পড়াশোনা শেখানোর কাজ। অপর্ণা জানাচ্ছেন, "না পড়ালে বাচ্চাগুলো সব ভুলে যাবে৷ তাই বড়রা কষ্ট সহ্য করে নেব। ওরা তো তা পারবে না। তাই এভাবেই ওদের ভুলিয়ে রেখে সামলে নেব। তবে বই খাতা ভিজে যাওয়ায় কতদিন এই ভাবে চলবে তা জানি না।"

হাজারো প্রতিবন্ধকতায় চোখের তলায় কালি। কিন্তু চোখে যেন আলোর দীপ্তি।  আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনের তিন কন্যা জানেন, একদিন এই ছেলেমেয়েরাই গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে, ঝড়ের চেয়েও দ্রুত বেগে ছড়াবে ওঁদের নাম।

Published by:Arka Deb
First published: