corona virus btn
corona virus btn
Loading

বছরে গুরুদক্ষিণা দু টাকা, তিনশো পড়ুয়াকে শিক্ষাদানে মশগুল সদাই ফকির

বছরে গুরুদক্ষিণা দু টাকা, তিনশো পড়ুয়াকে শিক্ষাদানে মশগুল সদাই ফকির
  • Share this:
  SARADINDU GHOSH  

#পূর্ব বর্ধমান: সরকারি হিসেবে অবসর নিয়েছেন পনোরো বছর আগে। বয়স ৭৫। তবে মনের বয়স অনেক কম। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত টিউশন পড়ানো তাঁর নেশা। পোশাকি নাম সুজিত চট্টোপাধ্যায়। তবে নিজের একটা নাম দিয়েছেন তিনি। সদাই ফকির। সেই সদাই ফকিরের পাঠশালায় এখন পড়ুয়ার সংখ্যা তিনশো। এই বাজারে টিউশন ফি বছরে দু টাকা। তাও দিতে হবে পাঠগ্রহণ সম্পূর্ণ হওয়ার পর। সুজিতবাবুর কথায়, গুরুদক্ষিণা। যা না নিলে শিক্ষাদান সম্পূর্ন হয় না। এই গুরুকুলের নিয়ম হলো, দু টাকা গুরুদক্ষিণা দিয়ে শিক্ষাগুরুকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাবেন পড়ুয়ারা। তবে সে নিয়মও মানতে পারে না অনেকেই। ছ মাস পর মনে করে গুরুদক্ষিণা দিয়ে যায় অনেকে।

লিখে রেখো একফোঁটা দিলেম শিশির। এটিই আপ্তবাক্য সদাই ফকিরের। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সারাবছর পড়িয়ে জ্ঞানসমুদ্রের এক কনা শিশিরটুকুই তিনি দিতে পারেন পড়ুয়াদের। শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষা দেন স্বভাব, চরিত্রগঠনেরও। পদে পদে মনে করিয়ে দেন সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। সহায় সম্বলহীনদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পড়ুয়াদের উত্সাহিত করেন।

পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম জঙ্গলের মাঝে বীরভূম জেলা লাগোয়া উত্তর রামনগর গ্রাম। সেখানেই বাস এই প্রবীন শিক্ষকের। মা আলোকলতার নামে পাঠশালার নাম আলোকতীর্থ। সবুজে ঘেরা শান্ত নিরিবিলি উঠানের শেষে টিনের চালের দেড়তলা মাটির বাড়ি। বাড়ির সামনে বাঁধানো কুয়ো, ধানের পালুই। সেই মাটির বাড়ির নিচের বারান্দায়, কখনও রোদ পিঠে নিয়ে পাঠশালা বসে সকালে। চলে সন্ধে পর্যন্ত। জঙ্গলের মাঝের এক একটি গ্রাম গেঁড়াই, বিষ্টুপুর, হেদোগেড়ে,জালিকাঁদর শ্রীকৃষ্ণপুর, নৃপতিগ্রাম, কুড়ুম্বা,পুবার। সেইসব গ্রাম থেকে পনের বিশ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পড়তে আসে ছেলে মেয়েরা। ভোরে বেরিয়ে টিউশন পড়ে স্কুল সেড়ে সন্ধেয় বাড়ি ফেরে তারা। সুজিতবাবুর ছোটবেলার পড়াশোনা গ্রামেরই রামনগর জুনিয়র হাইস্কুলে। এরপর বোলপুরের বাঁধগড়া হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন তিনি। জলপাইগুড়ি থেকে বিটি পাশ করে ১৯৬৫ সালে ২২ বছর বয়সে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। শিক্ষকতা শুরু হয় রামনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে। চল্লিশ বছর চাকরির পর ২০০৪ সালে অবসর নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ঘনিষ্ঠ এই শিক্ষক।

এলাকায় নিম্নবিত্ত পরিবারের সংখ্যাই বেশি। তাদের দারিদ্রের মধ্যে জীবনসংগ্রাম বরাবরই নাড়া দিত এই শিক্ষককে। তাই ৬৫টাকার মাস মাইনেতে সাত ভাইকে মানুষ করেও অসহায় বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাশক্তিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বরাবর। স্কুল ছুটির পর আলাদা করে দরিদ্র মেধাবীদের পড়াতেন নিখরচায়। স্কুলেরই একটি ঘরে। অবসর নেওয়ার পরও স্কুলকে বিনাবেতনে পড়াতে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ সে আবেদন মঞ্জুর করেনি। বেকার হয়ে মুষড়ে পড়েছিলেন মনের দিক থেকে তরতাজা সুজিতবাবু। সেই সময় এক সকালে বহু দূরের গ্রাম থেকে কয়েকজন ছাত্রী আসেন তাঁর কাছে। টিউশন পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তারা। টিউশন ফির কথা উঠতেই মুখ মলিন হয়ে যায় তাদের। মনের কথা পড়তে সময় লাগেনি অভিজ্ঞ শিক্ষকের। শর্ত দেন, মন দিয়ে পড়তে হবে। বছর শেষে দিতে হবে এক টাকা গুরুদক্ষিণা। খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ছাত্রীদের মুখ। সেই পথ চলা শুরু সদাই ফকিরের পাঠশালার।

এতো কম গুরুদক্ষিণা কেন- সুজিতবাবুর কথায়, এমনিতেই এক একটি ছেলেমেয়েকে তিনটে চারটে করে টিউশন পড়তে হয়। সেজন্য মোটা টাকা খরচ করতে হয় তাদের পরিবারকে। এছাড়াও পড়াশোনার অন্যান্য খরচও আছে। আমি যদি আবার অন্যদের মতো টিউশন ফি নিই তাহলে খুবই সমস্যায় পড়বে তারা। হয়তো অনেকে পড়াই ছেড়ে দেবে। নিষ্পাপ সরল এই ছেলেমেয়েদের হাসিমুখের উজ্জ্বলতার কাছে টাকা পয়সা কিছুই নয়। অর্থ নয়, পিছিয়ে পড়া এলাকার এই পড়ুয়াদের ভালবাসাই পাথেয় সদাই ফকিরের।

First published: December 17, 2019, 2:34 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर