দক্ষিণবঙ্গ

corona virus btn
corona virus btn
Loading

যন্ত্রণা পেলেও আর দল বদলে নারাজ শিশির, দিব্যেন্দুকে নিয়ে সংশয় ঘনিষ্ঠদের

যন্ত্রণা পেলেও আর দল বদলে নারাজ শিশির, দিব্যেন্দুকে নিয়ে সংশয় ঘনিষ্ঠদের
তৃণমূলে কোণঠাসা পিতা-পুত্র৷
  • Share this:

#কাঁথি: দুই ছেলে বিজেপি-তে গিয়েছেন৷ এটাই যেন তাঁর অপরাধ৷ ছয় দশকেরও বেশি রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে এসে এখন তাই নিজের দলের কাছে শুনতে হচ্ছে উপসর্গহীন বেইমানের মতো কটাক্ষ৷ সে সবও মুখ বুজে সয়েছেন কাঁথির শান্তিকুঞ্জের প্রবীণতম সদস্য৷ কড়া বার্তা দিতে মঙ্গলবার দিঘা শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ শিশির অধিকারীর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, কাঁথির সাংসদ এর পরেও দলবদল করবেন, এমন সম্ভাবনা শুধু ক্ষীণই নয়, নেই বললেই চলে৷

শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পরেও কেন প্রকাশ্যে তার বিরোধিতায় কিছু বললেন না শিশিরবাবু, এটাই তৃণমূল নেতাদের রাগের অন্যতম কারণ৷ ছোট ছেলে সৌমেন্দু বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পর এই রাগ আরও বেড়েছে৷ মঙ্গলবার সেকথা প্রকাশ্যে প্রায় বলেই ফেলেছেন তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ৷ শিশির ঘনিষ্ঠরা পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন, ছেলেদের বিরুদ্ধে যেমন শিশিরবাবু মুখ খোলেননি, সেরকমই তৃণমূল নেতারা অধিকারী পরিবারের সদস্যদের লাগাতার ব্যক্তিগত আক্রমণ করে গেলেও মুখ বুজে তা সয়েছেন শিশির অধিকারী৷ দলের নেতাদের আক্রমণে যন্ত্রণা পেয়ে ঘনিষ্ঠ মহলে দুঃখ করলেও প্রকাশ্যে একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি তিনি৷

শিশির অনুগামীরা বলছেন, এই বয়সে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বা ব্যক্তিগত ক্যারিশমা প্রমাণের প্রয়োজন নেই শিশিরের৷ ছয় দশকের বেশি বর্ণময় রাজনৈতিক কেরিয়ারে বার বার নিজের দাপট এবং প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছেন৷ গত দু' দশকে তার যথেষ্ট সুফল পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও৷

কাঁথি, অবিভক্ত মেদিনীপুর আর শিশির অধিকারী বঙ্গ রাজনীতিতে একটা সময় সমর্থক হয়ে উঠেছিল৷ পরে শিশিরের হাত ধরেই উত্থান শুভেন্দুর৷ ১৯৬৩ সালে প্রথমবার তৎকালীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় কাঁথির ভবানীচকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন শিশির অধিকারী৷ ১৯৬৯ সালে প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন কাঁথি পুরসভায়৷ পরের বছরই কাঁথির পুরপ্রধান নির্বাচিত হন তিনি৷ সেই শুরু৷ বাম আমলেও দশকের পর দশক কাঁথির গড় আগলে রেখেছেন শিশির৷ ১৯৮২ সালে কংগ্রেসের টিকিটে প্রথমবার দক্ষিণ কাঁথি থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি৷ কিন্তু ১৯৮৭ সালে দলীয় কোন্দলের জেরে তাঁকে টিকিট দেয়নি কংগ্রেস৷ কিন্তু কাঁথিতে তাঁর প্রভাব বোঝাতে অসুবিধা হয়নি শিশিরের৷ খোদ রাজীব গাঁধি প্রচারে এসেও কংগ্রেস প্রার্থীকে জেতাতে ব্যর্থ হন৷

শিশির অনুগামীরা বলছেন, দলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা, তৃণমূলে যোগদানের সময়ই বুঝিয়েছিলেন শিশির৷ কংগ্রেসের শক্তি তলানিতে পৌঁছলেও পুরোন দলকে ছাড়তে চাননি তিনি৷ কিন্তু বামেদের ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যেই একরকম বাধ্য হয়ে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি৷ কংগ্রেসে থাকাকালীন ১৯৯৮ সালে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী নীতীশ সেনগুপ্তের হারে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন শিশির অধিকারী৷ আবার, ১৯৯৯ সালে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর বিজেপি-তৃণমূল জোট প্রার্থী হিসেবে সেই নীতীশ সেনগুপ্তকেই কাঁথি থেকে জিতিয়ে আনেন তিনি৷ তৃণমূলের টিকিটে ২০০১ সালে ফের বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি৷ ২০০৬ সালে যখন তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা কমে ৩০-এ ঠেকে, সেবছরও নিজের দাপটে তৎকালীন বাম মন্ত্রী সিপিআই-এর প্রবোধ সিনহাকে এগরা থেকে হারিয়ে দেন শিশির৷ ছেলে শুভেন্দুকে তুলনামূলক নিরাপদ আসন দক্ষিণ কাঁথি ছেড়ে দিয়ে প্রবোধ সিনহার গড় এগরাতে গিয়ে তাঁকে হারিয়ে আসেন শিশির৷ ২০০৮ সালে শুভেন্দুকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ তৃণমূলের হাতে তুলে দেন শিশির অধিকারী৷ তার আগে পর্যন্ত জেলা পরিষদে তৃণমূলের সদস্য ছিল ২ জন, বামেদের ছিল ৫০৷ আসন পুণর্বিন্যাসের পর নির্বাচনের শেষে তৃণমূলের পক্ষে ফল ঘুরে হয় ৫২-২৷ এর পর ২০০৯, ২০১৪,২০১৯-এ সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন শিশির৷ এখনও দলের জেলা সভাপতির দায়িত্বে তিনি৷

তৃণমূল নেতারা যুক্তি দিচ্ছেন, শিশির অধিকারী কেন দলের জনসভায় আসছেন না৷ অথচ কয়েকদিন আগে পর্যন্ত খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার বার ফোন করে তাঁকে করোনা অতিমারির মধ্যে বাইরে বেরোতে নিষেধ করেছেন৷ শিশির অনুগামীরা বলছেন, পরিণত ছেলেরা যদি কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাঁর দায় কি বাবার?

শিশির অধিকারীর ঘনিষ্ঠরা নিশ্চিত, দল যে আচরণ তাঁর সঙ্গে করছে, তাতে শিশির অধিকারীর জনপ্রিয়তায় কোনও ভাঁটা পড়বে না৷ উল্টে কাঁথি এবং স্থানীয় এলাকায় তৃণমূলের প্রতিই ক্ষুন্ন হতে পারেন শিশির অনুগামীরা৷ বয়স আশি ছুঁলেও এখনও নিয়মিত অসংখ্য ফোন ধরেন শিশিরবাবু৷ সাংসদ হিসেবে আমজনতার যতটা সম্ভব সমস্যার সুরাহা করার চেষ্টা করেন তিনি৷ ফলে দল চূড়ান্ত কোনও পদক্ষেপ নিলেও শিশির অধিকারী ফের জার্সি বদল করবেন, এমন সম্ভাবনা খারিজই করে দিচ্ছে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল৷ এ দিনও ডিএসডিএ-এর চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত শুনে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, 'আমার নো অ্যাকশন- নো রিঅ্যাকশন'!

তবে শিশিরকে নিয়ে তাঁর অনুগামীরা নিশ্চিত হলেও দিব্যেন্দুকে অধিকারীকে নিয়ে এতটা নিশ্চিত হতে পারছেন না অধিকারী পরিবারের ঘনিষ্ঠরা৷ শুভেন্দু ইস্যুতে শিশিরের মতোই অবস্থান নিলেও কাঁথি পুরসভার প্রশাসক পদ থেকে সৌমেন্দুর হঠাৎ অপসারণ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন তমলুকের সাংসদ৷ কিন্তু যেভাবে শিশিরের মতোই তাঁকেও ক্রমাগত নাম না করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে, দলের মধ্যে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে, তাতে দিব্যেন্দুও শিশিরের মতো ধৈর্য দেখাবেন, সেই সম্ভাবনা কম৷ কারণ দিব্যেন্দুর বয়স কম, রাজনৈতিক ভবিষ্যতও পড়ে রয়েছে৷ তাছাড়া দলের দাবি মেনে শুভেন্দু বা নিজের ভাই সৌমেন্দুর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা তাঁর পক্ষেও সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নও থাকছে৷ ফলে কাঁথির শান্তিকুঞ্জের বাসিন্দা পিতা-পুত্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য৷

Sujit Bhowmik

Published by: Debamoy Ghosh
First published: January 12, 2021, 11:57 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर