‘মেয়ে হাতে দুশো টাকা দিয়ে সরে গেল’,সুরেলা রাণু মণ্ডলের জীবনের পরতে পরতে যন্ত্রণা!

‘মেয়ে হাতে দুশো টাকা দিয়ে সরে গেল’,সুরেলা রাণু মণ্ডলের জীবনের পরতে পরতে যন্ত্রণা!
রাণু মণ্ডল ৷
  • Share this:

#রাণাঘাট: ‘‘কুছ পা কর খোনা হ্যায়, কুছ খো কর পানা হ্যায়...।’’,‘‘মঙ্গলদ্বীপ জ্বেলে, অন্ধকারে দু’চোখ আলোয় ভরো প্রভু’’-একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন ৷ একগাল হাসির পিছনে রয়েছে লাখো লাখো জমাট বাঁধা যন্ত্রণার কাহিনি ৷ অজস্র মন খারাপের গল্প ৷ এখন তাঁর গান ভাইরাল ৷ রাণাঘাট স্টেশনে বসে রাণু মণ্ডলের গান এর মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ দেখে ফেলেছেন ৷ এখন তিনি রীতিমতো সেলেব্রিটি ৷ গান গাওয়ার জন্য ডাক আসছে বিভিন্ন জায়গা থেকে ৷ কেরলে অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিমানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বলে ফোন এসেছে ৷ ফোন এসেছে মুম্বইয়ের এক রিয়েলিটি শোয়ের তরফেও ৷ কিন্তু মাঝবয়সী রাণু মণ্ডলের এমন দশা হল কী করে ?

সেই কথা বলতে বলতে চোখে জল এল না ৷ এখনও প্রাণখোলা হাসি হাসতে পারেন তিনি ৷ আসলে দুঃখ পেতে পেতে আর কোনও আবেগই নাড়া দেয় না ৷ এখনও স্বপ্ন দেখেন গান গাইবেন ৷ এই গানই তো তাঁকে আরও একটা জীবনের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে ৷ আর সেই গানকেই সঙ্গী করে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ৷ আর সেই সব গল্পই ধরা পড়ল একটি ফেসবুক ভিডিওতে ৷

আরও পড়ুন: সুরেলা কণ্ঠে লতার গান গাইলেন রাণাঘাট স্টেশনের ভবঘুরে মহিলা, গোটা বিশ্বে ভাইরাল ভিডিও

এখন সব কিছু স্পষ্টভাবে মনে পড়ে না ৷ পুরনো দিনের নেগেটিভ ফিল্মের গায়ে লেগে থাকা ছত্রাকের মতো-ছন্নছাড়া ভাব ৷ বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগরের নতুনপাড়ায়। পরে তিনি রানাঘাটের বেগোপাড়ায় মাসির বাড়িতে চলে আসেন। মাসি চলে যান মুম্বইয়ে ৷ অল্প বয়স ৷ মাসির বাড়িতে দেখাশোনা-কাজ-কর্ম সবই করতেন ৷ সবই ঠিকঠাক চলছিল ৷ বিয়ে হয় ৷ স্বামী একটি হোটেলে রান্নার কাজ করতেন ৷ আঠারো বছরের সংসার। সেখানেই রয়েছে দুই ছেলেমেয়ে। ইতিমধ্যে মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকায় তিনি ফিরে আসেন বেগোপাড়াতেই।

৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে খানিকটা গেলে একটা চাষের জমি। তার পাশেই দু’টি ইটের ঘর আর একফালি বারান্দা নিয়ে এক তলা বাড়ি। পাশের বাঁশঝাড় থেকে পাতা উড়ে বিছিয়ে রয়েছে উঠোনে। এই বাড়িতেই বছর বারো ধরে রয়েছেন রাণু। মাসি থাকেন কলকাতায়। মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে মাসি আসেন তাঁকে দেখতে। দিন দুয়েক আগেই তিনি এক বার ঘুরে গিয়েছেন। রাণু আপন খেয়ালে থাকেন। ইচ্ছা হলে কোনও দিন রাতে বাড়ি ফেরেন। আবার, কোনও কোনও দিন ঘরের বাইরেই কেটে যায়। কোনও ভাবে লোকজনের থেকে চেয়েচিন্তে চালাচ্ছেন জীবন। তবে চাহিদা খুব সামান্যই। দশ-কুড়ি টাকা।

ঘরে একা-একা ভাল না লাগলে রাণু চলে যান রানাঘাট স্টেশনে। গান করেন। তাঁর পাশ দিয়ে চলে যান ব্যস্ত ট্রেনযাত্রীরা। কেউ আবার গান শুনে থমকে দাঁড়ান। রাণুর গান থামে না। কিন্তু রাণু এই গান শিখলেন কোথা থেকে? তিনি বলেন,‘‘কেউ গান শেখায়নি। নিজের চেষ্টায় রেডিয়ো আর টেপ রেকর্ডার থেকে গান শিখেছি। পরে একটা অর্কেস্ট্রা দলের সঙ্গে অনুষ্ঠান করেছি। মুম্বইয়ে যখন থাকতাম পাশেরবাড়ির এক কাকী ডায়েরিতে আমায় গান লিখে দিত ৷ সেই দেখে মুখস্থ করতাম ৷’’ কিন্তু এই সবের মধ্যেই দুঃখ একটাই সন্তানরা পাশে নেই ৷ রাণু বলেন, ‘‘মেয়ে হাতে দুশো টাকা দিয়ে সরে গেল ৷ কোথায় যে গেল?’’এতদিন যাঁকে দেখে ‘ভবঘুরে’,‘পাগলি’বলে দূরছাই করতেন ৷ আজই তাঁরা রাণুর গানে মুগ্ধ ৷ মাঝবয়সে এসেও রাণু দু’চোখজুড়ে স্বপ্ন ৷ গানে মেতে থাকার স্বপ্ন ৷ একটা নতুন জীবনের স্বপ্ন ৷

First published: 08:39:56 PM Aug 03, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर