EXCLUSIVE: করিডর রামপুরহাট, কীভাবে ঝাড়খণ্ডের গরু পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশে?

রামপুরহাট- দুমকা রোড ধরে পাচারের জন্য় গরু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷

  • Share this:

    #রামপুরহাট: আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের যে কোনও সীমান্তের থেকে রামপুরহাটের দূরত্ব অনেকটাই৷ বীরভূমের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সীমান্তও নেই৷ তবু বাংলাদেশে গরু পাচারের অন্যতম প্রধান করিডর হয়ে উঠেছে রামপুরহাট৷ নিউজ ১৮ বাংলার অন্তর্তদন্তে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য৷

    ধরপাকড়, গ্রেফতারি, সিবিআই, ইডি- সহ একাধিক সেন্ট্রাল এজেন্সির তৎপরতা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে গরুপাচার৷ আন্তঃরাজ্য সীমানা পেরিয়ে চলছে এই পাচার চক্র, ধাপে ধাপে সুসংগঠিত ভাবে প্রায় প্রতিদিন চলছে এই চোরাকারবার৷ সেই কারণেই গরু পাচারের তদন্তে নেমে সিবিআই আধিকারিকরা দাবি করেন, এই পাচার চক্রের পিছনে আসলে রয়েছে বড়সডড় সিন্ডিকেট৷

    কিন্তু কীভাবে চলছে এই চোরা কারবার? তা জানতেই নিউজ ১৮ বাংলা টিম সরজমিনেই ঘুরে দেখল গোটা প্রক্রিয়া৷ মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর ও নদিয়া- এই চার জেলা হল উত্তরবঙ্গ হয়ে গরু পাচারের রুট৷ উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা বাদ দিলে এই মুর্শিদাবাদ থেকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গরু পাচার চলছে বহাল তবিয়তে৷ বিশেষত, মুর্শিদাবাদ হয়ে গরু পাচারে এই মুহূর্তে বীরভূমের রামপুরহাট হয়ে উঠছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ মুর্শিদাবাদ হয়ে যে সমস্ত গরু সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে, তার অধিকাংশই আসছে ঝাড়খণ্ড থেকে৷ আর সেই কারণেই গুরুত্ব বেড়েছে রামপুরহাটের৷ একমাত্র রামপুরহাট থেকে ঝাড়খণ্ড সীমানা সড়কপথে লাগে মাত্র ওকে ঘণ্টা৷ একটাই রাস্তা, যা সোজা সীমানা টপকে চলে যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডের দুমকায়৷ রাস্তার নাম দুমকা - রামপুরহাট রোড৷ এটাই ১৪ নম্বর জাতীয় সড়ক৷

    রামপুরহাটের তাৎপর্য:

    মুর্শিদাবাদ বা মালদহ থেকে বাংলাদেশে গরু পাচার হয়৷ কিন্তু তা আসে কোথা থেকে? আসে ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে৷ বিশেষ করে হরিপুর, মালুতি, মহিষাদহরী, মাসানিয়া, চিরুদিহ, জগৎপুর, রামগড় সহ এগারোটির বেশি এলাকা থেকে প্রথমে গরু আসে সরেসডাঙ্গায়৷ প্রতি সোমবার খাতায় কলমে হাট বসলেও আদতে এই জায়গা থেকেই দেশি গরু ও জার্সি গরু বাংলা হয়ে বাংলাদেশে পাচার হয়৷ মূলত চারটি করিডোর হয়ে গরু বাংলাতে ঢুকে ওপার বাংলা বা বাংলাদেশে যায়৷

    প্রথম রুট: ঝাড়খণ্ডের মহিষাডহরি-বীরভূমের নলহাটি - রঘুনাথগঞ্জ- মুর্শিদাবাদ/মালদহ হয়ে বাংলাদেশ৷

    দ্বিতীয় রুট: ঝাড়খণ্ডের সরেসডাঙ্গা - দুমকা রোড ধরে ঝাড়খণ্ড চেক পোস্ট পেরিয়ে পিনাগরিয়া মোড় থেকে রণিকগ্রাম-মাড়গ্রাম - নারায়ণপুরের ভিতরের রাস্তা হয়ে নলহাটি - বীরভূম - মুর্শিদাবাদ৷

    তৃতীয় রুট: , ঝাড়খণ্ড-রামপুরহাট-সাঁইথিয়া-বহরমপুর৷

    চতুর্থ রুট: ঝাড়খণ্ড- আসানসোল- বর্ধমান-নদিয়া৷

    গত সোমবার অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি ভোর হওয়ার আগে থেকেই শুরু হয় নিউজ ১৮ বাংলার এই অন্তর্তদন্ত৷ ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কয়েক হাজার গরু আসবে সরেসডাঙ্গায়৷ গোপন সূত্রে এই খবর ছিল৷ সরেসডাঙা থেকে ঝাড়খণ্ড বর্ডার পেরিয়ে কেরিয়াররা গরু নিয়ে ঢুকবে বেঙ্গল এরিয়াতে৷

    রামপুরহাটে টাউন রাস্তা ধরে শীতের রাতে সোজা এগোচ্ছে আমাদের গাড়ি৷খবর সঠিক কি না, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা ছিলই৷ দুমকা - রামপুরহাট রাস্তার ধারে পাশের পাথর খাদানের ওপাস থেকে ধুলো উড়িয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি ছুটছে৷ প্রথম বাধা ঝাড়খণ্ড সীমানা৷ ঝাড়খণ্ডে স্বাগত জানিয়ে লেখা সাইনবোর্ড রয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তার কোনও চিহ্নমাত্র নেই৷ খারাপ রাস্তা, ধুলোয় চারদিকের দৃশ্যমানতা নেই বললেই চলে৷ তার উপর ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ গাড়ি ঢুকল ঝাড়খণ্ড সীমানায়, গন্তব্য, সরেসডাঙ্গার হাট৷

    ঘড়িতে প্রায় ভোর সাড়ে তিনটে৷ সরেসডাঙ্গার হাটে পৌঁছলেও কোথাও কোনও গরুর দেখা নেই৷ হাট তো ফাঁকা৷ কিন্তু একটু এগোতেই দেখা গেল অন্ধকার চিরে শত শত জোড়া চোখ এগিয়ে আসছে৷ গাড়ির হেডলাইট মারতেই নজরে এলো পাল পাল গরু৷ আর তার সঙ্গে জোনাকির মতো টর্চের টিমটিমে আলো৷ বোঝা গেল খবর সঠিক৷ হাজারে হাজারে গরু আসছে, একশো মিটার এগোতেই আবার একই দৃশ্য৷ গাড়ি থেকে নেমে প্রশ্ন করতেই হিন্দি টানে বাংলায় উত্তর এল, 'বাংলার দিকে যাচ্ছি বাবু, আগে হাটে যাবো৷ তার পর আমাদের ডিউটি পিনগড়িয়া মোড় আর ধুলিগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া৷ গরু পিছু ২০ টাকা৷'

    চলছে গরু পাচারের টাকার লেনদেন৷

    প্রশ্ন করা হল, পুলিশ ধরে না? ঝাড়খণ্ড বর্ডার আছে তো? চটপট উত্তর, 'পুলিশ টাকা চায়, দিয়ে দিলে ঝামেলা করে না৷' গরু গুলি কাদের? উত্তর, 'আমরা জানি না, আমরা শুধু নিয়ে যাই৷' আমরা আরও এগিয়ে গেলাম প্রায় চল্লিশ থেকে পয়তাল্লিশ কিলোমিটার ভিতরে৷ দৃশ্য সেই একই৷ পাল পাল গরু আসছে, কোনওটির গায়ে মার্কার দিয়ে গোল করা ( চিহ্নিতকরণের জন্য কোথায় যাবে), কোনওটির কানে স্টিকার দেওয়া৷ একটিই দড়ি দিয়ে একাধিক গরুর গলা আটকানো৷

    এতো গরু আসে কোথা থেকে? 'সে অনেক জায়গা থেকে', চটপট উত্তর দিয়েই সরে পড়লেন এক যুবক৷ পোষাকি নাম কেরিয়ার, লোকাল ভাষায় পাইকার মানে যাঁরা চাহিদা অনুযায়ী গরুর পাল নির্দিষ্ট করে৷

    প্রসঙ্গত গোটা রাস্তায় একজন পুলিশকর্মীরও দেখা মেলেনি৷ আরও একটু এগোতে দেখলাম নিকশ কালো অন্ধকারের মধ্যে রাস্তা জুড়ে এগিয়ে আসছে পাল পাল গরু৷ আর টর্চের আলোর বিন্দুর সংখ্যা বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারাই এই পালকে দিক নির্ণয় করে নিয়ে চলেছে৷

    গরু পাচারের জন্য যে শুধুমাত্র রাতের অন্ধকারকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে, এমন নয়৷ দিনের বেলাতেও নিশ্চিন্তে চলে গরু পাচার৷ কখনও দু' তিন দিন হাঁটিয়ে, কখনও আবার মোটর ভ্যানে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে একসঙ্গে পাঁচ থেকে দশটি গরুকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ এরকমই একটি মোটরভ্যানের পিছু নিয়েছিলাম আমরা৷ দেখা গেল দুমকা -রামপুরহাট রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে এসে ঠিক ঝাড়খণ্ডের অস্থায়ী চেকপোস্ট এড়াতে দু' কিলোমিটার আগেই এবড়ো খেবড়ো গ্রামের কাঁচা রাস্তe ধরল মোটরভানগুলি৷ ধুলিগ্রাম, মাড়গ্রাম, লোহাপুর হয়ে ভিতরের রাস্তায় দিয়ে সাঁ সাঁ করে ছুটছে মোটরভ্যান৷ আশেপাশে রয়েছে আদিবাসী গ্রাম৷ ভিতরের এই কাঁচাপাকা রাস্তা দিয়েই গরু পৌঁছে যাচ্ছে নলহাটি হয়ে মুর্শিদাবাদে৷ আর সেখান থেকে সোজা বর্ডার টপকে বাংলাদেশ৷ এলাকাবাসীর কথায়, শেষ পাঁচ মাস ধরে পাচার অনেক কম হচ্ছে৷ ধরপাকড়ের ভয়ে এখন তুলনায় গরুর সাপ্লাইও কমেছে৷ কিন্তু পাচার থামিয়ে রাখা যায়নি৷

    Sukanta Mukherjee

    Published by:Debamoy Ghosh
    First published: