সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে ছেদ! কোনও জগদ্ধাত্রী প্রতিমাই ঘুরবে না রাজবাড়ি, কৃষ্ণনগরের 'বুড়িমা' এবার লরিতে বিসর্জন!

ফাইল ছবি

অতিমারির জেরে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর একাধিক রীতি, ঐতিহ্যে এ বছর ছেদ পড়তে চলেছে। বিসর্জনের আগে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে না কোনও প্রতিমাই। সব প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করে সোজা নিয়ে যেতে হবে জলঙ্গির ঘাটে।

  • Share this:

#কৃষ্ণনগর: 'কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী চাষাপাড়া বারোয়ারির 'বুড়িমা' নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে রাজবাড়ির দিকে...', এ বছর এ কথা আর শোনা যাবে না।  তাই মনখারাপ কৃষ্ণনগরের। শহরের বাসিন্দারা কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছেন না মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিরঞ্জনের উদ্দেশে জলঙ্গিতে পাড়ি দেবে লরি, ম্যাটাডোর কিংবা রাসের গাড়িতে। কারণ জন্মাবধি কেউ মনেই করতে পারছে না চাষাপাড়া বারোয়ারি, কাঁঠালপোতা বারোয়ারি, হাতারপাড়া বারোয়ারি, চকেরপাড়া বারোয়ারি, বাঘাডাঙ্গা বারোয়ারি, কলেজস্ট্রীট বারোয়ারি, বউবাজার বারোয়ারি, তাঁতি পাড়া বা  গোলাপট্টী  বারোয়ারির প্রতিমা কোনও দিন সাঙ ছেড়ে লরিতে গিয়েছে নিরঞ্জনের জন্য। কারণ, এটাই যে সুপ্রাচীন শহরটার শতাধিক বছরের ঐতিহ্য।

অতিমারির জেরে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর একাধিক রীতি, ঐতিহ্যে এ বছর ছেদ পড়তে চলেছে। বিসর্জনের আগে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে না কোনও প্রতিমাই। সব প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করে সোজা নিয়ে যেতে হবে জলঙ্গির ঘাটে। সেখানে যত দ্রুত সম্ভব নিরঞ্জন সম্পন্ন করতে হবে। কার্নিভ্যালের আদলে ঘট বিসর্জনের শোভাযাত্রাও বন্ধ থাকছে। শহরের এক দিনের পুজোয় যতটা উন্মাদনা থাকে, ঠিক ততোই অপেক্ষা থাকে বিসর্জনের শোভাযাত্রার জন্য। পুজোর ঠিক পরের দিন দুপুরে ঘট বিসর্জনের পর রাত নামতেই সাঙে করে প্রতিমা প্রথমে রাজপথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রাজবাড়িতে। সেখানে প্রদক্ষিণের পর তা ফের একই রাস্তা দিয়ে জলঙ্গির ঘাটে নেওয়া হয় নিরঞ্জনের জন্য। তবে এবার এই দৃশ্যও দেখা যাবে না সম্ভবত। সৌজন্যে করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ।

বুধবার রাতে এমন ঐতিহ্য মেনে পুজো করা প্রায় ৪৪টি পুজো কমিটির সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় বসেছিল স্থানীয় প্রশাসন। প্রকাশ করা হয়েছে গাইডলাইন। জানা গিয়েছে, প্রায় সকলেই অবস্থার কথা বিবেচনা করে প্রশাসনের অনুরোধে সম্মতি জানিয়েছেন। তবে সাঙে প্রতিমা না নিয়ে অন্যকিছুতে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ায় ঘোর অনীহা কর্মকর্তাদের। জানা গিয়েছে, কোভিড পরিস্থিতিতে কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর বিধি বেঁধে দিল প্রশাসন। এবার স্থানীয় রীতি মেনে ঘট বিসর্জন করা যাবে না। দুপুর ২টো থেকে রাত ৯টার মধ্যে নিরঞ্জন শোভাযাত্রা শেষ করতে হবে। প্রশাসনিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মণ্ডপে ২৫ জনের বেশি ঢুকতে পারবেন না, মানসিক দেওয়ার ব্যাপার থাকলে আলাদা বন্দোবস্ত রাখতে হবে। মণ্ডপ হবে খোলামেলা। রাখতে হবে মাস্ক ও স্যানিটাইজার। যেখানে শতাধিক ঢাকি থাকেন, সেখানে পর্যন্ত সর্ব্বোচ্চ ১০জন ঢাকি থাকবেন।

চাষাপাড়া বারোয়ারির পুজো কমিটির সদস্য গৌতম ঘোষ বলেন, ঘট বিসর্জন বা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এ বছর হবে না। ঐতিহ্য মেনে কোনও ঠাকুরই রাজবাড়ি যাবে না। এ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। তা সত্ত্বেও অবস্থা বিবেচনা করে এটা মানতেই  হচ্ছে। একই কথা জানিয়েছেন শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা হাতারপাড়া বারোয়ারির কর্মকর্তারাও। কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা অরিন্দম সিনহা জানিয়েছেন, "হাতারপাড়ার অন্যতম আকর্ষণ ঘট বিসর্জনে। প্রতিবারে প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান আমাদের একপ্রকার অধিকার স্বরূপ হয়ে গিয়েছে। সেটা এবারে করোনার জেরে বন্ধ রাখা হচ্ছে। কষ্ট হলে, তা মেনে নিতেই হচ্ছে। কিন্তু সাঙে প্রতিমা না নিয়ে অন্য কিছুতে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা কেউই মেনে নিতে পারছি না। বাড়ির মহিলাদের পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত মন ভেঙে দিয়েছে। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে প্রতিমা সাঙে বিসর্জনের অনুমতি দেয়।"

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ বিসর্জনের শোভাযাত্রা। শহরের বড় বড় পুজোগুলির ঘট বিসর্জন হয় সকালে। সন্ধ্যের পর থেকে শুরু হয়ে যায় সাঙে করে ঠাকুর ভাসানের পর্ব। কৃষ্ণনগর তো বটেই, এমনকি দূর দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা সারারাত জেগে রাজপথে দাঁড়িয়ে বা বসে বিসর্জন দেখেন। ভোর রাতে মেজমা,  ছোটমা ও বুড়িমার দর্শন করে তবে তাঁরা ঘরে ফেরেন। প্রথা অনুযায়ী, সব পাড়ার ঠাকুর বেহারাদের কাঁধে চেপে আগে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির সামনে যায়। তারপর শহরের রাজপথ ধরে জলঙ্গি নদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

কিন্তু কেন এই রীতি? কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের রাজপরিবারের মহিলা সদস্যরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে প্রতিমা দর্শন করার অনুমতি পেতেন না। তাঁরাও যাতে ঠাকুর দেখার সুযোগ পান সেই জন্য রাজ পরিবার শুরু করে এক নিয়ম। ঠিক করা হয়, সমস্ত ঠাকুর আগে রাজবাড়ি প্রদক্ষিণ করবে, তারপর জলঙ্গি নদীতে বিসর্জন হবে। রাজবাড়ি ঘোরার সময় মহিলা সদস্যরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই ঠাকুর দেখতেন। আজও সেই নিয়ম আড়ম্বরের সঙ্গে পালন হয়ে আসছে।

Published by:Shubhagata Dey
First published: