অলৌকিক দরগায় ‘ঊরস মোবারক অনুষ্ঠান,’ পড়ে নিন একের পর এক অজানা গল্প

অলৌকিক দরগায় ‘ঊরস মোবারক অনুষ্ঠান,’ পড়ে নিন একের পর এক অজানা গল্প

বীরভূমের পাঁড়ুইয়ে খুষ্টিগিরী দরগাহ শরীফে শুরু হল ‘ঊরস মোবারক অনুষ্ঠান।’ ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই অনুষ্ঠান। এই উপলক্ষে বীরভূম জেলা তো বটেই পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও মানুষরা আসে এখানে।

  • Share this:

#পাঁড়ুই:  বীরভূমের পাঁড়ুইয়ে খুষ্টিগিরী দরগাহ শরীফে শুরু হল ‘ঊরস মোবারক অনুষ্ঠান।’ ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই অনুষ্ঠান। এই উপলক্ষে বীরভূম জেলা তো বটেই পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও মানুষরা আসে এখানে। মহাসাধক হজরত আব্দুল্লাহ কেরমানীর পবিত্র সমাধী-সহ বহু স্মৃতিবিজড়িত সৌন্দর্য্যের লীলানিকেতন ‘খুষ্টিগিরী দরগাহ শরীফ।’ বীরভূম জেলার সিউড়ি-বোলপুরের মধ্যবর্তী স্থান পাঁড়ুই থেকে কুড়মিঠাগামী বসে চড়লে যাওয়া যায় খুষ্টিগিরী। এর মনোরম পরিবেশ মনকে টানে অতীতের দিকে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কত মানুষ আসে খুষ্টিগিরী দরগায় তার ইয়ত্তা নাই। কত বলা-মসিবত, রোগ-শোক, অভাব-অভিযোগ সহ যন্ত্রণাকাতর অসহায় মানুষ ফিরে পায় শান্তিময় জীবন। গতিহীন মানুষের ক্লান্ত জীবনে ফিরে আসে নতুন গতি, দিশেহারা খুঁজে পায় আলোক পথের সন্ধান। বীরভূম জেলার এই উজ্জ্বল সম্প্রীতি ক্ষেত্র ‘খুষ্টিগিরী দরগাহ শরীফ’ এর প্রতিষ্ঠাতা মহামানব সৈয়দ শাহ আব্দুল্লাহ কেরমানী। তাঁর জন্ম ৮৫৪ বঙ্গাব্দে। তিনি বিশ্ব নবীর ২৭ তম বংশধর। তাঁর উর্দ্ধতন গুরু সুপ্রসিদ্ধ পীর সুফি খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে মহামানব কেরমানী সুফি মতাদর্শ প্রচারে বীরভূমের সেনভূম পরগনার গভীর জঙ্গলে উপনীত হন। সেখানে তাঁর গুরু মখদুম শাহ আরজানীর দেওয়া দাঁতন কাঠি সবুজ হয়ে ওঠে। গুরুর পূর্ব নির্দেশ মত সেখানেই তিনি আশ্রম গড়েন। নাম রাখেন খুশতিগিরী বা খুষ্টিগিরী; অর্থাৎ আনন্দ আশ্রম।এখানকার যাবতীয় কৃতিত্ব মহাসাধক হজরত কেরমানীর প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের অলৌকিক শক্তির সঙ্গে জড়িত। এখানকার ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ― হজরত কেরমানীর বৃহৎ গম্বুজ বিশিষ্ট মাজার শরীফ, জামে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, পঞ্চগম্বুজ, কুতুবখানা, নহবতখানা, লঙ্গরখানা, ১৪ কাজীর কবর, তেঁতুলগাছ, গঙ্গাগড়ে, খাসমহল, হজরত মিউজিয়াম, নূতন মিনার, অনুষ্ঠান মঞ্চ ও মনোরম বাগান - ‘নিশাত বাগ’। ◆ মসজিদ : জানা যায়, কেরমানী সাহেব তাঁর যুগে আল্লার উপাসনার জন্য একটা মসজিদ তৈরির কাজ শুরু করেন। ঐ মসজিদের কড়িকাঠ তৈরির সময় মিস্ত্রি মাপ ভুলে কড়িকাঠ ছোট করে দেয়। কেরমানী সাহেবকে মিস্ত্রি একথা জানালে তিনি আল্লার নিকট প্রার্থনা করেন। ফলে পরের দিন ছোট কড়িকাঠ বড় হয়ে যায়। মিস্ত্রি সেগুলো দেওয়ালে লাগিয়ে মসজিদ তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করে। কেরমানী সাহেবের সেই ঐতিহাসিক মসজিদ দীর্ঘকাল থাকার পর বিনষ্ট হয়ে যায়। পরে ১১৩৯ হিজরীতে মন্দুর শাহ নামক এক সওদাগর ঐ ভগ্ন মসজিদের ভিত্তির উপরেই নতুন মসজিদ নির্মাণ করান। সেই বৃহৎ মসজিদটি কেরমানী সাহেবের জিভ ছিলা থেকে জন্মানো তেঁতুলগাছের ছায়ায় দন্ডায়মান। ◆ তেঁতুল গাছ : মসজিদের পশ্চিম গায়ে ‘গঙ্গাগড়ে’ পুকুরের দক্ষিণে কেরমানী সাহেবের আমলের এক পুরোনো তেঁতুল গাছ আছে। এই তেঁতুলগাছের জন্ম বৃত্তান্ত অদ্ভুত। যখন কেরমানী সাহেবের প্রভাব-প্রতিপত্তি চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করছে ― সেই সময় খুষ্টিগিরীর কয়েক মাইল দূরে মঙ্গলডিহি গ্রামে এক সিদ্ধপুরুষ থাকতেন। তাঁর নাম ছিল শ্রীপর্ণগোপাল ঠাকুর।

কেরমানী সাহেব ও ঠাকুর মহাশয় উভয়ে উভয়ের ক্ষমতা ও খ্যাতির কথা শুনেছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে আলাপ ছিল না। একদিন ঠাকুর মহাশয় নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শনের ও কেরমানী সাহেবের অলৌকিক ক্ষমতা কীরূপ জানার উদ্দেশ্যে খুষ্টিগিরী অভিমুখে বাঘের পিঠে চড়ে অগ্রসর হন। সে সময় কেরমানী সাহেব তাঁর ‘খানকাহ’ বা আশ্রমের একটি ভাঙা প্রাচীরে বসে জিভ ছিলছিলেন ― তিনি ঠাকুরের অভিপ্রায় বুঝতে পারলেন। তিনি মনে করলেন, ঠাকুরকে এগিয়ে আনা তাঁর কর্তব্য। তাই জিভছিলাটি ফেলে দিয়ে প্রাচীরটিকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। আশ্চর্য! তাঁর অসাধারণ শক্তিবলে অচল প্রাচীর সচল হয়ে এগিয়ে চললো। মাঝপথে উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটলো ও বন্ধুত্ব হলো। এদিকে তাঁর জিভছিলাটি মাটিতে পড়ে সরস হয়ে উঠলো এবং তেঁতুলগাছে পরিণত হলো। সেই দীর্ঘদিনের পুরোনো বিশাল তেঁতুলগাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে। ◆ গঙ্গাগড়ে : উক্ত তেঁতুলগাছটির সামনেই ‘গঙ্গাগড়ে’ পুষ্করিণী। সেযুগে পুকুরটি খুবই ছোট ছিল। কেরমানী সাহেব সেসময় এক নপিতকে ক্ষৌর কার্যের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। নাপিত একবার পৌষ সংক্রান্তিতে গঙ্গাস্নানে যাবে বলে তাঁর কাছে ছুটি চাইল কিন্তু তা মঞ্জুর হলো না। স্বজাতিদের গঙ্গাস্নানে যেতে দেখে তার মন ব্যাকুল হয়ে পড়লো। গঙ্গাস্নানের নির্দিষ্ট দিনে কেরমানী সাহেব তার দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। সে সব কথা জানালো। তিনি তাকে বললেন, ‘চিন্তার কিছু নাই, সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’ নাপিত ভাবলো আজকেই উদ্ধারণপুর গিয়ে গঙ্গাস্নান করা সম্ভব নয়। কেরমানী সাহেব তাঁর আশ্রমের এই ছোট পুকুরটিতে ডুব দিতে বললেন নপিতকে। নাপিত বললো, ‘এখানে ডুব দিয়ে কী হবে?’ তিনি বললেন এখানে ডুব দিলে গঙ্গাঘাটে উঠবে এবং সেখানে স্নান সেরে খুষ্টিগিরী উদ্দেশ্য ডুব দিলে তুমি এই ঘাটেই উঠবে। নাপিত তাঁর কথামত ডুব দিয়ে গঙ্গাঘাটে উঠলো। সেখানে স্নান সেরে পশ্চিম মুখে ডুব দিতেই খুষ্টিগিরীর ঘাটে উঠলো। সেই থেকে পুকুরটির নামকরণ হলো ‘গঙ্গাগড়ে’। ◆ ১৪ কাজীর কবর : কেরমানী সাহেব ‘দুলাল’ নামে একটা ছাগল পুষেছিলেন। সে সময় কেরমানী সাহেবের কাছে ১৪ জন কাজী তাঁর আশ্রমের সেবক নিযুক্ত ছিল। হৃষ্টপুষ্ট ছাগলটিকে দেখে তাদের লোভ হলো। একদিন সবাই মিলে ছাগলটিকে খেয়ে ফেলল। কেরমানী সাহেব সেদিন ‘দুলাল’-কে দেখতে না পেয়ে খুব খোঁজ করলেন। পরে বুঝতে পারলেন কাজীদের কার্যকলাপ। সাধের ‘দুলাল'’-কে হারিয়ে তিনি অন্তরে আঘাত পেলেন। তিনি তাদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা যদি কেউ আমার দুলালের সন্ধান জানো, তো বলো।’ কিন্তু সকলেই একবাক্যে উত্তর দিলো, ‘আমরা কিছু জানি না।’ তিনি পুনরায় তাদের বললেন, ‘তোমরা যদি কেউ দুলালকে চুরি করে খেয়ে থাকো তাহলে স্বীকার করো, আমি মাফ করে দেবো।’ কিন্তু কাজীর দল নিজেদের ভুল স্বীকার করলো না। তখন তিনি ‘দুলাল-দুলাল’ বলে ডাক দিলেন এবং সেই ১৪ জনের পেট থেকে দুলাল সাড়া দিলো ― আর সঙ্গে সঙ্গে ১৪ জন কাজীর মৃত্যু ঘটলো। মসজিদের বারান্দার উত্তরগাত্রে ৭ জন কাজীর কবর একত্রে বাঁধানো আছে। আর অপর ৭ জন কাজীর কবর কেরমানী সাহেবের সমাধির পদতলে সারিবদ্ধ রয়েছে। ◆ নহবতখানা : হজরত কেরমানী সাহেবের খ্যাতি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি মসজিদের সামান্য পশ্চিমে অর্থাৎ ‘গঙ্গাগড়ে’ পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একটি পাকা দ্বিতল গৃহ নির্মাণ করেন, এটিই নহবতখানা নামে পরিচিত। এখানে সন্ধ্যার পর অভিজ্ঞ বাদ্যকররা বাজাতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। সন্ধ্যার নির্জনতায় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সকলের মনে জেগে উঠতো এক আনন্দের শিহরণ। এই বাদ্যযন্ত্রের সুর তরঙ্গে ভেসে উঠতো বিশ্বপ্রভুর নাম, ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ ― ‘নাই, নাই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আমার’। আর সেই সঙ্গে সাধকেরা ও ভক্তেরা আল্লার প্রেমে ও জিকিরে মশগুল হয়ে পড়তেন।

একদিন এক ব্যক্তি রাজনগরের রাজার কাছে সংবাদ দেয় যে, কেরমানী সাহেব বীরভূম আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই প্রত্যহ সন্ধ্যায় তিনি তাঁর সৈন্যদের বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনির মাধ্যমে কুচকাওয়াজ করান। এই সংবাদ পেয়ে রাজনগরের রাজা কেরমানী সাহেবের বাজনা বন্ধ করার আদেশ দেন। কেরমানী সাহেব বাদ্যকরদের বাজনা বন্ধ করতে বলেন, ফলে খুষ্টিগিরীর বাদ্যধ্বনি বন্ধ হয়, আর সেই সঙ্গে রাজনগরের রাজবাড়ীর নহবতখানার বাদ্যধ্বনিও বন্ধ হয়ে যায়। সেখানকার বাদ্যকররা বহু চেষ্টা করেও বাদ্যযন্ত্র থেকে সুর তুলতে ব্যর্থ হয়। রাজনগরের রাজা কেরমানী সাহেবের এই অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হন। কেরমানী সাহেবের কাছে এসে তাঁর ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং খুষ্টিগিরীতে নহবতখানার বাজনা বাজানোর অনুমতি দেন। কেরমানী বাবা ৯৪৩ বঙ্গাব্দের ১১ ফাল্গুন পরলোকগমন করেন। সেজন্য প্রতি বছর ১১ থেকে ১৫ ফাল্গুন তাঁর পবিত্র সমাধি প্রাঙ্গণে বার্ষিক স্মৃতি উৎসব 'ঊরস' অনুষ্ঠিত হয়। ‘ঊরস’ উৎসবের অর্থ মিলন বা আনন্দ উৎসব। কোনো মহামানবের তিরোধান দুঃখের নয়, বরং আনন্দের। কেননা ইহজগৎ ত্যাগ করে তাঁরা পরম শান্তি লাভ করেন। প্রতি বছর ঊরস উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে একটি মেলাও বসে। এই ঊরস মেলা উপলক্ষ্যে ১১ ফাল্গুন বাবার সমাধিতে পুণ্যার্থীরা দলে দলে চাদর-আতর-ফুল-শিরণী দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১২ ফাল্গুন সারারাত বাবার জীবনাদর্শ ও সুফী মতবাদ আলোচিত হয়। এছাড়া ১৩ ফাল্গুন সারারাত উর্দু কাওয়ালী, ১৪ ফাল্গুন ফকিরী-মুর্শীদি সংগীত ও ১৫ ফাল্গুন বাউল সংগীতের অনুষ্ঠান চলে। এই সুফী দরগাহর প্ল্যাটফর্মে সম্প্রীতিময় মিলন মেলায় শত বিভেদের প্রাচীর ভেঙে মানব হৃদয়ে একতার সুর বাজে। সর্ব মানবের মিলিত নির্মল আনন্দের পুণ্য স্রোত ছড়িয়ে পড়ে দূর দুরান্তে।

SUPRATIM DAS
First published: February 25, 2020, 9:52 AM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर