‘‘NRC, CAA নিয়ে আমরা চিন্তিত নই..." জানালেন গেঁওখালির পর্তুগিজ গ্রামের বাসিন্দারা

‘‘NRC, CAA নিয়ে আমরা চিন্তিত নই...

বহুকাল আগে পর্তুগাল থেকে ভারতে এসেছিলেন তাদের পূর্বপুরুষেরা।

  • Share this:

Sujit Bhowmik

#মহিষাদল: ‘‘শেকড়ের কথা ভেবে আজও অন্য দেশের বিরুদ্ধে ফুটবল ম্যাচ হলে পর্তুগালকেই সাপোর্ট করি। কিন্তু ভারত-পর্তুগাল ম্যাচ হলে ভারতবর্ষকেই সমর্থন করব। কারণ আমরা ভারতবাসী। তাই NRC কিংবা CAA নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।’’ বড়দিন উপলক্ষে শুরু হওয়া উৎসবের মাঝে মহিষাদলের পর্তুগিজ গ্রাম মীরাপুরের বাসিন্দারা একথাই শোনালেন।

বহুকাল আগে পর্তুগাল থেকে ভারতে এসেছিলেন তাদের পূর্বপুরুষেরা। পর্তুগাল থেকে এসে তাদের পুর্বপুরুষেরা ঠিক কত শতক আগে ভারতে এসেছিলেন সেটা ঠিকঠাক জানেনও না বর্তমান বংশধররা। শুধু জানেন পর্তুগাল থেকে কয়েক শতক আগে আসা তাদের সে সময়ের বংশধরেরা ভারতে এসে প্রথম গোয়ায় বসবাস শুরু করেছিলেন। অনেক পরে এও জেনেছেন, এলাকা জুড়ে বর্গী হানা ঠেকাতে মহিষাদলের রাজা গোয়া থেকে ১২ জন বলবান পর্তুগিজ সিপাহিকে এনেছিল নিজের রাজ প্রাসাদে। যারা বর্গী তান্ডব ঠেকাতে সেসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন মহিষাদলে। যাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য পরে রাজারাই গেঁওখালির মীরপুর গ্রাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।

IMG-20191228-WA0155

সেখানে থাকতে থাকতেই পর্তুগিজরা বাংলার সংসার ধর্মে ঢুকে গিয়ে পুরোপুরি বাঙালিই হয়ে গিয়েছেন। চালে বোলে বাঙালি, চলন বলনেও ষোলো আনা বাঙালীয়ানা মীরপুরের বাসিন্দাদের জীবন যাপনে। সেই 'বাঙালীরাই' বলছেন - "এনআর স নিয়ে আমরা ভাবছিই না। চিন্তাও করছিনা। কারন, আমাদের আদি পুর্বপুরুষের শেকড় পর্তুগাল দেশে থাকলেও আমরা কিন্তু পুরো ভারতবাসীই।" ইতিমধ্যেই বড়দিনকে কেন্দ্র করে হুগলির ব্যান্ডেল, কলকাতার সেন্ট পলস্ চার্চের পাশাপাশি সেজে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার গেঁওখালির মীরপুর পর্তুগিজ পাড়ার দুই ঐতিহাসিক চার্চ।

ডিসেম্বর মাস পড়ে যাওয়ার পর থেকেই বড়দিনের আনন্দ উৎসব শুরু হয়েছে মীরপুর গ্রাম জুড়ে। মীরপুরে মূলত দুটি ঐতিহাসিক গির্জা রয়েছে। যার মধ্যে একটি ক্যাথলিক এবং অপরটি প্রটেস্টান্ট। গেঁওখালি থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে এই মীরপুর পর্তুগিজ পাড়া। সুদূর বিস্তৃত বাঙালি পরগনার মাঝে মীরপুরের এই পর্তুগিজরা বর্তমানে বাঙালি সংস্কৃতিতে মিলেমিশে একাকার। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন মীরপুরের পর্তুগিজদের মধ্যে থাকলেও রক্তের মধ্যে রয়েছে তাদের পূর্বপুরুষদের ছোঁয়া। আর সেই নিয়েই আজও গেঁওখালি মীরপুরে পেদেরা, লঘু, ডি ক্রুস, রোজারিও, তেসরা, প্রভৃতিদের বসবাস। আর এই বড়দিন আসলে তাদের মধ্যে জেগে ওঠে নতুন উন্মাদনা। চার্চে চার্চে শুরু হয়ে যায় প্রভু যীশুর নামে প্রার্থনা।

ইতিমধ্যে মীরপুরে বড়দিনকে উপলক্ষে চলছে মেলা। গির্জার দেওয়ালে পড়েছে নতুন রঙের প্রলেপ। এই মেলা চলবে পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত। সবকিছু নিয়েই গেঁওখালির মীরপুর পর্তুগিজ পাড়ার মানুষজন এখন উৎসবের মেজাজে। তবে এই বাঙালি পরগনার মধ্যে কিভাবে পর্তুগীজদের আগমন ? পর্তুগীজ অধিবাসী রতন তেসরা জানান, "১৭৪২ সালে তৎকালীন বাংলা যখন বর্গী হামলায় অতিষ্ঠ ঠিক সেই সময় বাংলার বিভিন্ন নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে গোয়ার পর্তুগিজরা। এমন সময় মহিষাদলের তৎকালীন রাজা আনন্দমোহন উপাধ্যায় মনে করেন বাংলায় বর্গী হামলা থেকে বাঁচতে এই পর্তুগিজরা প্রকৃত উপযুক্ত। এরপরই মহিষাদলের রাজা গেঁঁওখালি মীরপুরে বেশ কিছুটা নিঃশুল্ক জমিতে এই সকল পর্তুগীজদের আশ্রয় দেন।"

সেই থেকেই আজও গেঁওখালির মীরপুরে পর্তুগিজদের বসবাস।  তাদের মধ্যে কারোর পদবী তেসরা আবার কারোরবা ডি ক্রুস। নামের মধ্যে সকলের পর্তুগিজদের ছোঁয়া থাকলেও বর্তমানে তারা মিশে গেছে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে। তবে ধর্মীয় রীতি মেনে বড়দিন এলে প্রভু যীশুর উপাসনা তেই মেতে ওঠেন এই পর্তুগিজরা। প্রবীণ পর্তুগিজ সদস্য পল তেসরা বলেন, "বর্তমানে আমরা যারা রয়েছি আমাদের গোয়া থেকে আগমন না ঘটলেও আমাদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন গোয়া থেকে। যাদের আগের বংশধররা গোয়ায় এসেছিলেন পর্তুগাল থেকেই। তবে এখন আমরা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে প্রবল ভাবে মিশে গেছি।"

First published: December 29, 2019, 8:40 AM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर