গ্রাম আছে, রাস্তা নেই, তাই ‘কুটুম’ ভেঙে যাওয়ায় গ্রামে বাড়ছে আইবুড়োর সংখ্যা

গ্রাম আছে, রাস্তা নেই, তাই ‘কুটুম’ ভেঙে যাওয়ায় গ্রামে বাড়ছে আইবুড়োর সংখ্যা
  • Share this:

Venkateswar Lahiri

#বর্ধমান: শহরের কাছেই। তবু শহর থেকে বিচ্ছিন্ন বিনোদবাঁধ। রাস্তা বেহাল, কুটুম ভেঙে যাওয়ায় গ্রামে বাড়ছে আইবুড়োর সংখ্যা।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার সদর শহর আসানসোলের কাছেই রয়েছে বিনোদবাঁধ গ্রাম। শুধুমাত্র বেহাল রাস্তার কারনে নগর সভ্যতা আর উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে একটা গোটা গ্রাম।। কারন দামোদর তীরবর্তী বিনোদবাঁধ গ্রাম থেকে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যেকোনও শারীরিক অসুস্থতা কিংবা প্রসব যন্ত্রণা উঠলে প্রমাদ গোনেন গ্রামের মানুষ। গ্রামবাসীদের কথায়, পাকা রাস্তা না থাকায় বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে ছেলে মেয়েদের। অর্থাৎ গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে বেহাল রাস্তার জন্য।

গ্রামের নাম বিনোদবাঁধ। ভৌগলিক অবস্থান দেখতে গেলে বিনোদবাঁধ পাণ্ডব বর্জিত গ্রাম কিন্তু নয়। গ্রামের পশ্চিমে তিন কিলোমিটারের মধ্যে জমাটি বাজার চিনাকুড়ি কোলিয়ারি এলাকা। গ্রামের দক্ষিণে চারকিলোমিটারের মধ্যে ইস্পাত শহর বার্ণপুর। গ্রামের উত্তর পূর্বে দু থেকে আড়াই কিলোমিটারে মধ্যে রানীসায়ের মোড়ে মিলবে আসানসোল চিনাকুড়ি সড়ক ও ইস্কো বাইপাস রোড। পশ্চিম বর্ধমান জেলার সদর শহর আসানসোলে থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে বিনোদবাঁধ গ্রাম। আর প্রশাসনিক অবস্থানে , আসানসোল পুরনিগমের ৯৯ নম্বর ওয়ার্ডের কুলটি বিধানসভার হীরাপুর থানার আওতাধীন এই গ্রামটি। বার্নপুর, চিনাকুড়ি বা মিঠানী গ্রামে ঢোকার যে রাস্তা রয়েছে তা চলাচলের অযোগ্য। চারচাকা গাড়ি শুধু নয়, দুচাকা গাড়ি নিয়ে গ্রামে যাওয়া প্রায় অসাধ্য। গোটা রাস্তা খানাখন্দে ভরা আর মাটির পরিবর্তে রয়েছে বড় বড় পাথর। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় বোল্ডার। প্রায় ৩০ বছর আগে ডিসেরগড় নোটিফায়েড থেকে বোল্ডার আর মোরাম দিয়ে চলাচলের যোগ্য রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাস ওই পর্যন্তই ৷ গত ২৫ বছর আগে সেই মোরাম কবে বৃষ্টির জলে ধুয়ে সাফ হয়ে গেছে। পড়ে রয়েছে শুধু পাথর বা বোল্ডার। ওই রাস্তায় পায়ে হেঁটে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব। ডিসেরগড় নোটিফায়েড পরিবর্তিত হয়ে কুলটি পুরসভা হয়েছে। বর্তমানে কুলটি পুরসভা অবলুপ্ত হয়ে আসানসোল পুরনিগম। কিন্তু বিনোধবাঁধ থেকে গেছে সেই তিমিরেই।

তফশীলি ও আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে ১২০০ পরিবারের বসবাস। দিনমজুরি চাষ আবাদ ছাড়াও রেলে কয়লা খনিতে ও স্কুলের শিক্ষকতা করেন এমন লোকও রয়েছেন। গ্রামে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র, রয়েছে বিদ্যুত, নেই শুধু রাস্তা। গ্রামের চারটি পাড়া বাঁধ পাড়া, উপর পাড়া, জোড় পাড়া আর পলাশডিহা। গ্রামের ভেতরের বেশকিছু রাস্তা ঢালাই করা। কিন্তু চারপাশ দিয়ে গ্রামে ঢোকার রাস্তা নিয়ে কেউ কখনও ভাবেননি। গ্রামবাসীদের অভিযোগ কয়েকদিন আগেই গ্রামের ৩৫ বছরের যুবক বাবলু বাউরীর বুকে ব্যাথা ওঠে, রক্ত বমি শুরু হয়। কিন্তু কোনও গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে ঢোকেনি। তাই বাবলুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেও তাঁরা পারেনি। স্থানীয় গ্রামবাসীদের অভিযোগ কুলটির বিধায়ক উজ্জল চট্টোপাধ্যায় ২০ বছর ধরে বিধায়ক। তিনি বিনোদবাঁধের সমস্যার কথা জানেন। প্রতি বছর ভোট এলে আশ্বাস দেন কিন্ত আজও কিছুই করেননি।

গ্রামবাসীদের কথায়, পাকা রাস্তা না থাকা আর বেহাল রাস্তার কারণে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। বাইরে থেকে কুটুম আত্মীয়রা দেখাশোনা করতে এলেও বিয়ে পাকা হচ্ছে না। সারা বছর ধরে এক একটি মেয়ের ৩০ থেকে ৩৫ টা বিয়ের সম্বন্ধ আসার পর তবে গিয়ে বিয়ে লাগছে। গ্রামে আইবুড়ো (অবিবাহিত) মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য অঞ্চলের মেয়েরাও এ গ্রামের ছেলেদের বিয়ে করতে রাজি হচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মহিলা সরকারি চাকুরীজীবী বললেন, এখনও পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি বিয়ের সম্বন্ধ এলেও বেহাল রাস্তার কারণে একটাও পাকা হয়নি। গ্রামের অনেকেই বলছেন বিবাহযোগ্য হয়ে উঠলেও তাঁদের বিয়ে পাকা হচ্ছেনা। গ্রামে কষ্ট করে যদিও বা কেউ ঢুকছেন কিন্তু কোনওমতে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা আর এমুখো হচ্ছেন না।

ভোট আসে ভোট যায় । কিন্তু হাল ফেরেনা এই বিনোদ বাঁধ গ্রামের। এই গ্রাম আনাগোনা দেখেছে অনেক নেতা মন্ত্রীদের। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাঁরা শুধু চান পাকা রাস্তা। তাহলেই বিনোদবাঁধ আসবে শহরের সংযোগে।

First published: 01:00:10 PM Jan 06, 2020
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर