পথশিশুদের খাবার থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা...আসানসোলের "ফুডম্যান" গড়ল অনন্য নজির

পথশিশুদের খাবার থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা...আসানসোলের

পেশা শিক্ষকতা, নেশা খিদের জ্বালায় ছটফট করা অভুক্ত পথ শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া... তিনি চন্দ্রশেখর কুন্ডু

  • Share this:

Venkateswar Lahiri

#কলকাতা: পেশা শিক্ষকতা, নেশা খিদের জ্বালায় ছটফট করা অভুক্ত পথ শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া... তিনি চন্দ্রশেখর কুন্ডু। শুধু আত্মবিশ্বাসকে মূলধন করে হতদরিদ্র পথশিশুদের জীবন পরিবর্তনে গোটা দেশকে দিশা দেখাচ্ছেন এই বাঙালি শিক্ষক।

দিনটা ছিল ২০১৫ সালের ৬ জুলাই। চন্দ্রশেখর কুন্ডুর ছেলের জন্মদিন। জন্মদিনের পার্টি সেরে বাড়ি ফিরছিলেন এই শিক্ষক। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী চন্দ্রিমা এবং পুত্র শ্রীদীপ। নিমন্ত্রিতদের খাওয়া-দাওয়ার পরও সেদিন বেঁচে যায় অনেক খাবার! এদিকে তাঁর দু'কামরার ছোট ফ্ল্যাটে ছোট ফ্রিজ, বেঁচে যাওয়া খাওয়ার বাড়ি নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই! রাখবেন কোথায় ? অতঃপর খাবার ফেলে দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই! খাবার ফেলে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎই চন্দ্রশেখরবাবুর চোখ যায় পাড়ার একটি নোংরা ডাস্টবিনের দিকে। উপচে পড়া ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে খাচ্ছে দুই পথশিশু।

সেই রাতেই দুই শিশুকে বাড়ি নিয়ে যান চন্দ্রশেখর কুন্ডু । কিন্তু বাইরে পার্টি ছিল, কাজেই বাড়িতে কোনও খাওয়ার নেই। স্ত্রী শিশু দুটিকে ডিমের অমলেট বানিয়ে যত্ন সহকারে খেতে দেন, ছেলে জন্মদিনে পাওয়া চকোলেট দিয়ে দেয় বাচ্চাদুটিকে।

সেই রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারেননি আসানসোল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষক চন্দ্রশেখর কুন্ডু। সেদিন থেকেই শুধুমাত্র তাঁর নিজের শহর আসানসোল নয়, গোটা রাজ্য, এমনকী দেশের নানা প্রান্তের অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর ভাবনা শুরু করেন চন্দ্রশেখর। কলেজে গিয়ে ইন্টারনেট সার্চ করতেই এক ভয়ঙ্কর তথ্য নজরে আসে...জানতে পারেন, দেশে বছরে ৮৮ হাজার কোটি টাকার খাবার নষ্ট করি আমরা। যার ১০ শতাংশের অঙ্ক প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা এবং আমাদের দেশের মিড ডে মিলের বাজেট বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, শুধু ১০ শতাংশ বাঁচালেই অনেকটা সমস্যার সমাধান হবে! এরপরই, তথ্য জানার অধিকার আইনে সরকারকে চিঠি লেখেন চন্দ্রশেখর কুন্ডু। উত্তর আসে পরিসংখ্যান সহ। ফুড কর্পোরেশনের গোদামে গত দু'বছরে নষ্ট হয়েছে বাইশ হাজার কোটি টাকার খাদ্য শষ্য যা দিয়ে এক কোটি বাচ্চাকে একমাস ধরে মিড ডে মিল খাওয়ানো যেত। খাবার ও খাদ্য শষ্যের এই অপচয় রোধের জন্য প্রচার ও আইন আনার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখেন রাষ্ট্রপতিকে। গতানুগতিক উত্তর এলেও কোনও সদর্থক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। তাই এবার নিজেই নামেন ময়দানে । কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে "Stop Food Wastage" নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানান। খুব ভাল সাড়া পান।

খোঁজ নিতে শুরু করেন বিভিন্ন হস্টেল ক্যান্টিনের বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে। পেয়েও যান সন্ধান। ১২০০ টাকা দিয়ে কেনেন একটা বড় টিফিন কেরিয়ার। দুপুরে একঘণ্টার জন্য বেরিয়ে, বেঁচে থাকা খাবার নিয়ে পৌঁছে যেতে থাকেন আসানসোল রেল স্টেশনের কাছে কিছু পথশিশুদের কাছে। কিছুদিন পর বুঝতে পারেন তিনি যে কাজটা করতে চান, তা মোটামুটি ভালভাবেই করতে পারছেন! পরবর্তী পদক্ষেপ হল, তাঁর মিশন বৃহত্তর ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া। যেমন ভাবা তেমনি কাজ... ছবি পোস্ট করতে শুরু করেন স্যোশাল মিডিয়ায়। রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় সেই পোস্টগুলি। অনেকে এগিয়ে আসেন। বন্ধু অভিজিৎ দেবনাথ, অমিতাভ চক্রবর্তী এবং অপূর্ব চ্যাটার্জীকে নিয়ে গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'ফুড এডুকেশন অ্যান্ড ইকনমিক ডেভলপমেন্ট' সংক্ষেপে 'ফিড'। বড় বড় ক্যান্টিন ও ব্যারাকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন । তাদের বেঁচে যাওয়া খাবার বর্তমানে রোজ পৌঁছে যায় কলকাতার জোকা, সাদার্ন অ্যাভিনিউ, আসানসোল সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অভুক্ত শিশুদের কাছে। 'ফুডম্যান' চন্দ্রশেখর বাবু পত্রিকায় পড়েন, ভারতের Hunger Index নেমে যাওয়ার খবর। যার মূল কারণ অপুষ্টি ও রাতে খালি পেটে থাকা। শুরু করেন অপুষ্টিতে থাকা বাচ্চাদের জন্য রোজ রাতের খাবারের ব্যবস্থা করার প্রকল্প । একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, Indian Academy of pediatrics ও কিছু শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় বর্তমানে তিনটি জায়গায় চলছে এই প্রকল্প। উপকৃত ১৫০জনেরও বেশি শিশু! তবে, লোকবল ও অর্থাভাবে রাতের খাবার পোঁছানোর প্রকল্প সব জায়গায় শুরু করা সম্ভব হয়নি, তবে সেসব জায়গায় শুরু করা হয়েছে প্রোটিন ক্লাব। পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের মোচরাকোন্দা, জামাইপাড়া গ্রাম এবং দিল্লির নেহেরু নগরে ১২০ জনেরও বেশি শিশু, যারা অপুষ্টিতে ভুগছে তাদের সপ্তাহে চার দিন শুধু ডিম দেওয়া হয়।

চন্দ্রশেখরবাবু বলেন " সরকারকে সবসময় দোষারোপ করা উচিত নয়। ধরুন কিছু হতদরিদ্র বাচ্চা থাকে কোনও ওভার ব্রিজের তলা দখল করে, কিংবা নিরুপায় হয়ে ফুটপাথ দখল করে। এরকম জায়গায় কাজ করি আমরা। শুধু খাবার ও পুষ্টি নয়। পড়াশোনা স্বাস্থ্য ও স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষাদানও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। " তিনি আরও জানান, অনেক পথশিশুই স্কুল যেতে চাইত না। যারা যেত, তারাও কিছুদিন পর উৎসাহ হারিয়ে ঘরে বসে থাকত। বাবা মা নিরক্ষর, কাজেই স্কুল থেকে ফেরার পর বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর কেউ নেই। এই সমস্যা দূর করতে ফেসবুকে আবেদন করেন তিনি। এগিয়ে আসে কলকাতার ডাক্তারদের সংগঠন 'ভেগাস'। এখনও পর্যন্ত রাজ্যে তৈরী হয়েছে পাঁচটি "বই টই হই চই" স্কুল। স্কুলগুলিতে ২১০ জন বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে সাত জন শিক্ষিকাকে। পূর্বা বাউরি, শান্তি হাঁসদা, রাধা হাড়িরা পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দিচ্ছে সমাজ সচেতনতার পাঠও।

কলকাতার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাথে থাকা প্রিয়াঙ্কা, অনিল, অনিমার মতো ১৫জন বাচ্চাদের আঁকা শেখানো ও নিয়মিত প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করেছেন চন্দ্রশেখরবাবু। প্রতি মাসে শিল্পী বন্ধু অর্পিতা দাসগুপ্তের তত্ত্বাবধানে গোলপার্কের 'ট্রাইব' নামের একটি ক্যাফেতে চলে 'পথের পিকাসো' প্রকল্প। ছবি বিক্রির টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে পথশিশুদের অভিভাবকদের হাতে যাতে তাদের পরিবারেরও কিছুটা অভাব দূর হয়। প্রতিদিন নুন আনতে পান্তা ফুরনো অবস্থা, দিনমজুরি করে কোনওক্রমে দিন গুজরান করেন। এদের অনেকেরই দুবেলা দু'মুঠো অন্ন জোগাড় করা কার্যত বিলাসিতারই সমান। চন্দ্রশেখর বাবুর পাশে থাকতে এগিয়ে আসছে কলকাতা শহরের আরও কিছু ক্যাফেটেরিয়াও। যেখান থেকে পথ শিশুদের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর মাধ্যমে ফুটপাথবাসীর মুখে হাসি ফোটানো। শহরের এরকমই একটি ক্যাফের কর্ণধার শিল্পা চক্রবর্তীর কথায়, 'পথ শিশুদের আঁকা ছবি আমরা এখানে রাখছি। চাহিদাও ভাল। ওদের আঁকা ছবি দেখে অনেক গ্রাহক তাজ্জব হয়ে যাচ্ছেন। সব সময় ওদের পাশে থাকব।'

দিনমজুর বাবা- মা রা বাচ্চা খুব অসুস্থ হয়ে না পড়লে হাসপাতালে যান না একদিনের মজুরি হারানোর ভয়ে। তাই পথশিশুদের চিকিৎসার জন্য খুলেছেন 'ফুটপাথ ডিসপেন্সারি' প্রকল্প। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অতনু ভদ্রের মাধ্যমে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন সারা দেশের ২৫ হাজার শিশুদের ডাক্তার। কলকাতার ধর্মতলা, সাদার্ন অ্যাভিনিউ এবং দিল্লির তিলক নগরে ইতিমধ্যে খুলে গিয়েছে 'ফুটপাথ ডিসপেন্সারি'। প্রতি মাসে একবার ফুটপাথেই ওষুধসহ বসছেন নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞরা। চন্দ্রশেখর বাবু বলেন " দেশকে নতুন দিশা দেখাতে পারি আমরাই। অপরকে দোষারোপ না করে নিজের নিজের এলাকায় এই প্রকল্পগুলি শুরু করার বার্তা নিয়েই এপ্রান্ত সেপ্রান্ত ছুটে বেড়াই। সমাজের বন্ধু হিসেবে পাশে থাকতে চাই"। মাস শেষ হতে আর হাতেগোনা কটা দিন। তারপরই নতুন বছর। নতুন প্রত্যাশা। যে প্রত্যাশা চন্দ্রশেখরবাবুকে হয়ত আরও নতুন লড়াইয়ের শপথ নিতে শেখাবে। যে শপথ ভালোবাসার, ভাললাগার, পথশিশুদের পাশে থাকার।

First published: December 12, 2019, 5:14 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर