অভিষেকের গড়ে ঢুকছে ভোটের গাড়ি, দক্ষিণের দুর্ভেদ্য অঞ্চলে দাঁত ফোটাতে পারবে বিজেপি?

অভিষেকের গড়ে ঢুকছে ভোটের গাড়ি, দক্ষিণের দুর্ভেদ্য অঞ্চলে দাঁত ফোটাতে পারবে বিজেপি?

ভোটতৃতীয়ায় কী হবে অভিষেক গড়ে, বইবে মোদি হাওয়া?

তৃণমূল কি পারবে ভোটতৃতীয়ায় গড়রক্ষা করে ভোটের লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে যেতে, নাকি পদ্মশিবির সিঁদ কাটবে?

  • Share this:

#কলকাতা: হাতে আর একদিন। শুরু হচ্ছে বাংলার তৃতীয় দফার নির্বাচন। হাওড়‌া, হুগলি এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মোট ৩০টি আসনে ভোট হলেও রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি চর্চা দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা নিয়ে। একে তো একই সঙ্গে এই জেলার ১৬টি আসনের ভাগ্য পরীক্ষা, অন্যদিকে এই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণাই তৃণমূলের ধাত্রীভূমি, আরও পরিষ্কার করে বললে, তমলুক কাঁথিকে যদি শুভেন্দুর গড় বলা হয়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে অভিষেক গড় বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। লোকসভা ভোটের গেরুয়া ঝড়ের মধ্যেও এই দূর্গে ফাটল ধরাতে পারেনি বিজেপি। সঙ্গত কারণেই আলোচনা, তৃণমূল কি পারবে ভোটতৃতীয়ায় গড়রক্ষা করে ভোটের লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে যেতে, নাকি পদ্মশিবির সিঁদ কাটবে?

এই আলোচনার শুরুতেই গত লোকসভার নিরিখে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কয়েকটি আসনে ফলাফল দেখে নেওয়া জরুরি। ধরা যাক বাসন্তীর কথাই। আরএসপির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এই আসনে বিজেপির ঠাঁই ছিল না কস্মিনকালে। ১৯৮২ থেকে ২০০৬ একটানা জিতে এসেছেন সুভাষ নস্কর। এমনকি ২০১১ সালের তৃণমূল ঝড়েও সুভাষ নস্করকে গদিচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। অঙ্কটা বদলে যায় ২০১৬ সালে। তৃণমূল প্রার্থী গোবিন্দচন্দ্র নস্কর এই আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতেন। শেষ লোকসভা ভোটেও লিড ধরে রাখতে পেরেছিল বাসন্তী। তৃণমূল পেয়েছিল ১১,৩৩৮৪ ভোট, বিজেপি পেয়েছিল ৭২ হাজার ২৩৬ ভোট। এবার এই আসনে তৃণমূলের প্রার্থী শ্যামল মণ্ডল। আরএসপির প্রার্থী সুভাষ নস্কর। বিজেপির প্রার্থী রমেশ মাজি। অনেকেই বলছেন অন্তত এই আসনে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। আবার কুলতলিতে শেষ লোকসভা ভোটে তৃণমূল বিজেপির থেকে এগিয়ে ছিল ১০ হাজারের বেশি ভোটে। ক্যানিং পূর্বে এই লোকসভা তৃণমূল-বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লক্ষ ৪৩ হাজারেরও বেশি। ডায়মন্ডবারবার তৃণমূল পেয়েছিল ১,০৯,১৩৪ ভোট, বিজেপি পায় ৭৩,৬৭৩টি ভোট। তালিকা দীর্ঘ না করলেও এটুকুতেই পরিষ্কার, এই আসনগুলিতে ট্রেন্ড অনুসারে ঘাসফুলেই দোলা লেগেছে বাতাসের। কিন্তু তারপর বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এই ম্যানগ্রোভে ঘটনার ঘনঘটাও দেখা গিয়েছে।

আমফান ঝড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে এই অঞ্চলেই।  হাজার হাজার কাঁচা বাড়ি ভেঙে গিয়েছে। তৃণমূল সরকার নানা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছে, অনস্বীকার্য ভাবে তৎপরতা দেখিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু অর্থ বিলিবন্টনে ফাঁক দেখা দিয়েছে। বহু মানুষ টাকা পাননি, দু্র্নীতি অভিযোগ চাপা পড়ে থাকেনি। এই অভিযোগকে হাতিয়ার করেই সিঁদ কাটা শুরু করেছে বিজেপি। সারা রাজ্যে তো বটেই, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এই দুর্গজয়ে বিজেপি নেতারা এবার চেষ্টার কসুর করছেন না। নরেন্দ্র মোদি- অমিত শাহ-জে পি নাড্ডা-রা আসছেন এবং আমফানকেই ইস্যু করছেন। আর আঙুল তুলছেন দক্ষিণদুর্গের অবিসংবাদিত সম্রাট অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। পাল্টা প্রতিরোধও করছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী হয়নির বদলে কী হয়েছেকে এগিয়ে রাখছেন, আস্বস্ত করছেন যারা ত্রাণের টাকা পাননি সকলকে টাকা পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। কিন্তু ক্ষোভ রয়েছে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। আর এই ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হবে নাকি হবে নাকি স্বয়ং নেত্রীর বরাভয় শুশ্রুষা এনে দেবে তা লাখ টাকার প্রশ্ন।

শুধু আমফানই নয় স্থানীয় দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। ধরা যাক রায়দিঘি কেন্দ্রটির কথা। এই কেন্দ্রের প্রার্থী দেবশ্রী রায় দু'বার ভোটে জিতলেও কান পাতলেই শোনা যায় টোটো কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা। এছাড়াও সিন্ডিকেট রাজ বহু এলাকাতেই সুবিদিত। এর প্রভাব যে ব্যালটবাক্সে পড়বেই তা বলাই বাহুল্য।

উল্লেখ্য দক্ষিণ দূর্গে হানাদারি চালাতে বিজেপির বড় ভরসা ছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। শোভন ঘুঁটি সাজানো শুরুও করেছিলেন। তাঁকে দেখেই শেষ সময়ে বিজেপিতে চলে এসেছিল দীপক হালদাররা। কিন্তু বিজেপির তালিকায় শোভন চট্টোপাধ্যায়ের নাম না থাকাটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা দীর্ঘদিনের সংগঠক শোভন চট্টোপাধ্যায় সামনে থাকলে বিজেপি দক্ষিণ চব্বিশে যতটা ভালো ফল করতে পারত, যে পরিমাণ ভোট টানতে পারত, তা পারবে না।

মনে রাখতে হবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বহু মানুষ মৎস্যজীবী। বাঘ-কুমীরের সঙ্গে লড়াই করেই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হয় তাদের। এই বিষয়টি অনুধাবন করেই বিজেপি সংকল্পপত্রে মৎস্যজীবীদের বছরে ছয় হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে বিজেপি। এখানেই শেষ নয়, এই অঞ্চলের ভোট পেতে মরিয়া পদ্মশিবিরের ফোকাসে রয়েছে গঙ্গাসাগর মেলা। হিন্দু আবেগই এক্ষেত্রে ট্রাম্প কার্ড। ফলে লড়াই ২০১১ বা ২০১৬ সহজ নয়। তৃণমূলকে শ্রম দিতে হচ্ছে। আরও একটি বিষয় না বললেই নয়, সংযুক্ত মোর্চা আব্বাস সিদ্দিকির হাত ধরায় ভোট ভাগেরও ভয় থাকছে। আব্বাসের প্রার্থী যদি নাও জেতেন, তিনি ভোট কেটে বিজেপির পালে বাতাস দেবেন এ নিয়ে সন্দহের অবকাশ আছে কি?

এই অঞ্চলে একাধিক বার সভা করে গিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি নিজেই আব্বাস প্রসঙ্গ তুলে সংখ্যালঘুদের একত্রিত করতে চেয়েছেন। বিজেপির উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির পাশে নিজের উন্নয়ন মডেল রেখেছেন। আমফান নিয়ে ক্ষোভ আছে এ কথা যেমন সত্যি, স্বাস্থ্যসাথী লাখো মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছে এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। এর পাশাপাশি রয়েছে কন্যাশ্রী, যুবশ্রীর মতো প্রকল্প। তৃণমূল চাইছে সর্বাত্মক প্রচারে এইগুলিকেই এগিয়ে রাখতে। রাজনৈতিক মহলের মত, এরই পাশাপাশি তৃণমূলের প্রধান অস্ত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা। তৃণমূল চাইছে দলীয় কর্মীরা ভোটের বাজারে কোনও রকম অন্তর্দ্বন্দ্ব না রাখুক, যারা দল ছেড়েছেন তাদের জন্য দলের আপ্তবাক্য- যাক যা গেছে তা যাক। যা আছে তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শতকিছুর পরেও যার ইমেজ দল-প্রতীক এসবেরও ঊর্ধ্বে। সেই ইমেজ কি তৃণমূলকে বৈতরণী পার করবে, অনেকে বলছেন কাঁটা আছে, অনেকে আবার বলছেন তবু জয় নিশ্চিত। তবে শেষ হাসি কে হাসে জানা যাবে ২ মে, ফলাফল ঘোষণা হলেই।

Published by:Arka Deb
First published: