কেমিক্যাল হাবের পর ১২ বছর কেটে গেলেও নন্দীগ্রাম আছে নন্দীগ্রামেতেই

কেমিক্যাল হাবের পর ১২ বছর কেটে গেলেও নন্দীগ্রাম আছে নন্দীগ্রামেতেই
  • Share this:

#নন্দীগ্রাম: বিদেশী সংস্থার কেমিক্যাল হাব নির্মাণের সিদ্ধান্ত ও জমি অধিগ্রহণ ঘিরে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে । সংবাদ শিরোনাম হোক বা কৃষি বনাম শিল্পের অবশ্যম্ভাবী তর্কবিতর্ক-সবকিছুর আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে নন্দীগ্রামের নাম । নিজেদের কৃষিজমি রক্ষার লড়াইয়ে তৎকালীন বাম সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল নন্দীগ্রাম ।

কিন্তু ১২ বছর আগে ও পরে লড়াইয়ের কারণ অনেকটাই ভিন্ন ।

এই ভাঙাবেরিয়া ব্রিজেই গুলি চলেছিল ১৪ মার্চ, ২০০৭। এই ভাঙাবেরিয়া ব্রিজেই গুলি চলেছিল ১৪ মার্চ, ২০০৭।

১২ বছর আগে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই শিখিয়েছিল নন্দীগ্রাম কিন্তু আজ ১২ বছর পরে হতাশার চিহ্ন স্পষ্ট সেখানে। যে নন্দীগ্রাম একসময় রাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর মূল কেন্দ্র ছিল, আজ সেখানে যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়। বার্নস্ট্যান্ডার্ডের কেন্দ্রীয় জেলিহ্যাম প্রকল্প ঘিরেও আশাবাদী ছিলেন নন্দীগ্রামের যুবকরা ; এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে-আশাবাদী ছিলেন তাঁরা কিন্তু শেষপর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি । কেন্দ্রের তরফ থেকেও এই প্রকল্প নিয়ে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

১২ বছর পরে নন্দীগ্রামে কর্মসংস্থানের অভাবে যুবকদের ওড়িশা, কেরল ও মুম্বইয়ে পাড়ি দিতে হচ্ছে ।

প্রকৃতপক্ষে নন্দীগ্রাম কোনওদিনই শিল্পবিরোধী ছিল না, যে পদ্ধতিতে জমি অধিগ্রহণ করার কথা ভাবা হয়েছিল তারই বিরোধীতা করেছিলেন স্থানীয়রা । শুধুমাত্র নন্দীগ্রাম নয়, নন্দীগ্রামের দেখানো পথে তৎকালীন শাসকের বিরোধিতা করার সাহস দেখাতে পেরেছিল সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ । ১৪ মার্চে পুলিশের গুলি না চললে হয়তো রাজনৈতিক সমীকরণ অন্যরকম হত কিন্তু পালাবদলকে বাস্তব করে দেখিয়েছিল নন্দীগ্রাম ।

তবে দীর্ঘ সংগ্রামের হাত ধরে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও নন্দীগ্রামবাসীর স্বপ্নপূরণ হয়নি । সরকারের তরফ থেকে নানাবিধ প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে সেই সব প্রকল্পের সুবিধাও পেয়েছেন বাসিন্দারা কিন্তু যে সার্বিক বদলের আশা করেছিল নন্দীগ্রাম তা অধরাই থেকে গিয়েছে এখনও পর্যন্ত ।

কেমিক্যাল হাবের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে যে নন্দীগ্রাম শাসকের মোকাবিলা করার সাহস দেখিয়েছিল আজ উপার্জনের আশায় সেখানকার যুবকদের পাড়ি দিতে অন্য রাজ্যগুলিতে ।

কর্মসংস্থান ছাড়াও যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ।গ্রাম প্রধানের বাড়ির রাস্তাটুকু পাকা হলেও কাঁচা রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতে হয় স্থানীয়দের । নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণ করলেও প্রশাসনের তরফ থেকে বা নির্দিষ্ট কোনও যোজনা থেকেও তাঁরা কোনও সহায়তা পাননি , বরং সেই রাস্তাগুলি কোনও যোজনার আওতায় পড়ে না এই কথাও শুনতে হয়েছে স্থানীয়দের । বাসস্থান ও শৌচাগার- সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রাথমিক চাহিদাগুলির দাবি জানিয়ে আশাহতই হয়েছেন তাঁরা ।

vlcsnap-error115 vlcsnap-error866

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে রাজনৈতিক হেভিওয়েটদের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নন্দীগ্রাম । ২০০৯ সালের নির্বাচনে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে তৎকালীন বাম প্রার্থী লক্ষণ শেঠকে পরাস্ত করেছিলেন তৃণমূল প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী । ২০১৪ এর নির্বাচনে ফের বাম প্রার্থী শেখ ইব্রাহিম আলিকে পরাস্ত করেন তিনি। ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন শুভেন্দু অধিকারী ও উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করে সাংসদ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন তাঁর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী । ১২ বছরে রদবদল হয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণেরও । নন্দীগ্রামের কাছে একসময় খলনায়ক হয়ে উঠেছিলেন বাম নেতা লক্ষণ শেঠ ও । ২০১৯ এর নির্বাচনে অধিকারীদের শক্ত ঘাঁটিতেই ফের দিব্যেন্দু অধিকারীর বিপক্ষে কংগ্রেসের তরফ থেকে প্রার্থী হয়েছেন লক্ষণ শেঠ । ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ২৪৬৪৮১ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন দিব্যেন্দু অধিকারী । তবে খলনায়কের ভূমিকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হলেও গতকালই নন্দীগ্রামে প্রচারসভা করেছেন লক্ষণ শেঠ । নিজেদের দলীয় কার্যালয় খুলতে সক্ষম হয়েছে বামফ্রন্ট ।

তবে রাজনৈতিক সমীকরণ যাই হোক চিরাচরিত ঐতিহ্য মেনে ভোট দেওয়া থেকে পিছু হটতে নারাজ নন্দীগ্রাম । এই ভোটে ফিরিয়ে দেওয়া হোক সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা- এই মৌলিক অধিকারটুকুর আশা নিয়েই ১২ মে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন নন্দীগ্রামের ভোটাররা । আজও শিল্প চায় নন্দীগ্রাম; সঠিক পদ্ধতিতে গড়ে উঠুক শিল্প, সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক কর্মঠ যুবকরা, সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে আশা ছাড়ছে না নন্দীগ্রাম ।

First published: May 9, 2019, 5:08 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर