একলা থাকবে? কলকাতার প্রশ্ন চিহ্নে নাকাল হচ্ছে মেয়েরা, শহর নাকি প্রাপ্তবয়স্ক !

সারাদিন ধরে একের পর বাড়ি ভাড়াতে 'রিজেকশন' । কিন্তু ঘর তো একটা চাই । কি আর করা যাবে ? পরের উইকএন্ডে আবার অফিস কলিগদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নিধি।

Sarmita Bhattacharjee | News18 Bangla
Updated:Aug 08, 2018 05:17 PM IST
একলা থাকবে? কলকাতার প্রশ্ন চিহ্নে নাকাল হচ্ছে মেয়েরা, শহর নাকি প্রাপ্তবয়স্ক !
Photo: News 18 Bangla Creative
Sarmita Bhattacharjee | News18 Bangla
Updated:Aug 08, 2018 05:17 PM IST

#কলকাতা: আপনি কি একলা মেয়ে ? পেশার তাগিদে শহরে ঘর খুঁজছেন ? সব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে এই শহরে আপনার ঠাঁই নেই! শত মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও ‘ঘর’ পাবেন না । তবুও যদি কপাল জোরে ঘরের খোঁজ পান, গুণতে হবে মোটা টাকা ।

খাতায় কলমে শহরের বয়স বাড়ছে ঠিকই । কিন্তু মনের দিক থেকে ? আদৌ কি প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে আমার 'তিলোত্তমা' ? উত্তরটা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে ।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয় । আমার এক অফিস কলিগের থেকেই শোনা গল্পটা । ওরই একজন পরিচিত নিধি শর্মা । দিল্লির একটি মাল্টিন্যাশনাল সংস্থায় কাজ করত । ট্রান্সফার করা হয় তাঁকে কলকাতায় । একেবারে অচেনা শহরে এসে একটু নার্ভাস হয়েছিল বটে নিধি । কিন্তু অফিস কলিগদের আতিথেয়তায় সে ভুলেই গিয়েছিল যে, নতুন শহরে এসে পড়েছে সে । প্রথম ক'দিন অফিসের গেস্ট হাউসে দিব্বি কেটেছিল তার । কিন্তু একমাসের মধ্যেই ঘর খুঁজতে হবে । অচেনা শহরে তাই অফিস কলিগই ভরসা । তাদেরকেই বলেছিল নিধি একটা ভাড়া ফ্ল্যাট খুঁজে দেওয়ার জন্য । অবশেষে, একটা ছুটির দিনে আয়েশা তার দুই অফিস কলিগকে নিয়ে ঘর খুঁজতে বেরোয় । কিন্তু শহরে একলা মেয়েকে ঘর ভাড়া দেওয়া নিয়ে যে একটা বড়সড় ট্যাবু রয়েছে , তা নিধির অফিস কলিগরা কানাঘুষো শুনলেও সেদিন চাক্ষুষ করল ।

দমদম । ট্রেন, বাস, মেট্রো । যা চাই । সবই হাতের মুঠোয় । 'ব্রোকার'-দাদাদের ধরে কোনওমতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে দিন পেরিয়ে রাত হয়ে অবশেষে নিরাশ হয়ে ফিরে এল তারা । তবে, ঘরের আকাল কিন্তু নেই । একলা মেয়ে । দিল্লিতে থাকে । শুনেই কেমন যেন নাক সিঁটকে দৌড় দিচ্ছিলেন সকলে । আবার কেউ কেউ তো বলেই বসলেন, 'একলা মেয়ে ঘর ভাড়া দিয়ে উটকো ঝামেলা বাড়াই আর কি ! রাত বিরেতে শুরু হবে শেষে বেল্লালাপানা । কে সামলাবে ? না বাবু ওসব হবে না । এটা ভদ্দরলোকের পাড়া ।'

সারাদিন ধরে একের পর বাড়ি ভাড়াতে 'রিজেকশন' । কিন্তু ঘর তো একটা চাই । কি আর করা যাবে ? পরের উইকএন্ডে আবার অফিস কলিগদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নিধি। এবার ডেস্টিনেশন দক্ষিণ কলকাতা । দক্ষিণ কলকাতায় মেস বা পিজি ভাড়া বলতে বেশির ভাগ লোক যাদবপুরকেই বেছে নেয়। যাতায়াতের সুবিধে। বাস-ট্রেন, এমনকী সামনেই মেট্রো স্টেশন। আর সবথেকে বড় কথা, ‘কলোনি’র তকমা ঝেড়ে এখন ফ্ল্যাট সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে অনেকটাই আধুনিকতার মোড়কে মুড়ে নিয়েছে যাদবপুর । ওই তল্লাটে প্রচুর ফাঁকা ঘরও পাওয়া যায়। তুলনামূলক ভাড়া একটু বেশি । কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে যাদবপুর এখনও কলকাতার 'সেরা ঠিকানা' । তবে, যাদবপুর সাজ পোশাকে আধুনিক হয়েছে বটে । কিন্তু মন ? সেদিক থেকে দেখতে গেলে যাদবপুরও এখনও আটকে আছে সেই সংকীর্ণ চিন্তা-ভাবনায়! সেখানে ভাড়া খুঁজতে গিয়ে তো আরও অপমানিত হতে হল আয়েশাকে । 'একাধিক ছেলে কিন্তু একেবারেই অ্যালাউ করব না ।' কিংবা কখনও শুনতে হল 'রাত দশটার পর বাড়ি ফেরা যাবে না ।' আবার কেউ তো বলেই বসলেন, ‘পেপারে যা দেখছি ৷ রাত বিরেতে যদি কিছু হয় ৷ কে থানা পুলিশ করবে ? অত ঝক্কি পোয়াতে পারব না ৷’

Loading...

অবশেষে, তাদের 'ব্রোকার' দাদা অজয়ই আয়েশার অসহয়তার অবস্থা বুঝে সলিউশন দিল তাকে । তাঁর স্পষ্ট কথা, 'ম্যাডাম । আপনি একা মহিলা । কলকাতায় এমন মেয়েকে একলা ফ্ল্যাটে হোক কিংবা বাড়ি ভাড়া । কেউ দিতে চাইবে না । আপনি বরং সল্টলেকের দিকটায় একবার দেখতে পারেন ।' এই আলাপ আলোচনা চলাকালিনই ওই ব্রোকার দাদার থেকেই সল্টলেকের এক ব্রোকারের নাম নম্বর পায় নিধি । তত্ক্ষণাৎ আর দেরি না করেই সটান সল্টলেকের উদ্দেশে রওনা।

শান্ত শিষ্ট । গোছান একটা জায়গা । কলকাতার মধ্যে হলেও কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । তবে, কি এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে নিধি ? যথারীতি ওখানে পৌঁছেই ফোন করল সে ওই ব্রোকার দাদাকে । ফোন করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাইকে করে হাজির ব্রোকার দাদা । সে বলল, 'অজয়ের থেকে আমার সবটাই শোনা । আপনার কোনও সমস্যা হবে না । অনেকেই বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেওয়ার জন্য এখানে ফেলে রাখেন বাড়ি । আর নিজেরা বিদেশে থাকেন । শুধু মাসের একেবারে প্রথম তারিখে ব্যাঙ্কে টাকা পড়ে যাওয়া চাই ।' ব্রোকারের কথা শুনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল নিধি । কাঠখড় অনেক পোড়াতে হল ঠিকই । কিন্তু থাকার একটা বন্দোবস্ত তো হল ।

এ তো গেল নিধির কথা । আমাদের শহরে এমন কত মেয়ে রয়েছে । যাদের প্রতিদিন নাভিশ্বাস উঠছে শহরে একটা একা থাকার ঘর খুঁজতে গিয়ে । তিলোত্তমা । যে শহরের সঙ্গে একটা প্রবাদ আদিম কাল থেকে প্রচলিত রয়েছে । কলকাতার মন উদার । সকলকে আপন করে নিতে পারে । কিন্তু কোথায় সেই উদারতা-ভালবাসা ? দিনকে দিন কলকাতা যেন অচেনা হয়ে উঠছে তাদের পরিচিতদের কাছেই ।

আরও পড়ুন: রোজনামচার ইঁদুর দৌঁড়ে শহরতলীর মেয়েদের কাছে পেয়িং গেস্টই ভরসা

First published: 04:30:57 PM Aug 08, 2018
পুরো খবর পড়ুন
Loading...
अगली ख़बर