বাংলাদেশ নির্বাচন: উন্নয়ন অথবা গণতন্ত্র

News18 Bangla
Updated:Dec 10, 2018 08:21 PM IST
বাংলাদেশ নির্বাচন: উন্নয়ন অথবা গণতন্ত্র
Photo Collected
News18 Bangla
Updated:Dec 10, 2018 08:21 PM IST

প্রতিবেদন:  সুবীর ভৌমিক, ঢাকা

#ঢাকা: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদপে অর্থনীতিবিদ নয়, তবুও সম্প্রতি তাঁর বক্তব্যে বার বারই উঠে আসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ৷

২০০৮ থেকে ২০১৮ ৷ বাংলাদেশের মসনদে দশ বছরের রাজত্ব তাঁর ৷ এই দশ বছরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখেছে বাংলাদেশ ৷ অর্থনৈতিক দিক থেকে, সামাজিক দিক থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন নজর কাড়া ৷ এই উন্নয়নকে একদা ‘আ বাক্সেট কেস’ বলে অভিহিত করেছিলেন হেনরি কিসিংগার ৷ বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে উন্নয়নমূলক দেশ ৷

যদিও শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ বিরোধীদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে বহুবার ৷ এমনকী, ৩০ ডিসেম্বর সংসদীয় নির্বাচনেও বিরোধী দলের সঙ্গে কঠিন লড়াইয়েও সামিল হয়েছিল এই দল ৷ তবে হাসিনা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, জানিয়ে ছিলেন, ‘উত্তর দেবে ব্যালট বাক্সই...’

শেখ হাসিনার লক্ষ্যই হল ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘মিডল ইনকাম কান্ট্রি’ হিসেবেই গড়ে তোলা ৷ শেখ হাসিনা স্পষ্টই জানিয়েছেন, তিনি চান বাংলাদেশের মানুষ ফের তাঁর দলকে নির্বাচিত করুক, যাতে তিনি বাংলাদেশের এই আর্থিক উন্নয়নকে আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন৷

Loading...

বাংলাদেশের আর্থিক উন্নয়নের বার্ষিক হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ ৷ তবে শেখ হাসিনা এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী যে, আগামী আর্থিক বছরে বাংলদেশের আর্থিক বিকাশ ৮ শতাংশের মাত্রা অতিক্রম করবে ৷ সম্প্রতি এক সাংবাদিক বৈঠকে হাসিনা জানিয়েছেন, ‘আমরা যদি আবার নির্বাচিত হই ৷ তাহলে আগামী তিন বছরে আর্থিক উন্নয়নকে ১০ শতাংশ অবধি নিয়ে যেতে যাবতীয় চেষ্টা চালাব ৷ ’

বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দারিদ্র সীমার নিচে ছিল দেশের ৮২ শতাংশ মানুষ ২০১০ সালে যা দাঁড়ায় ১৮.৫ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয় ১৩.৮ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৯ শতাংশের নিচে থাকে ৷ সাম্প্রতিক দারিদ্র সীমানার হিসেব যা বলছে, তাতে ২০২১ -এর মধ্যে অতিরিক্ত দারিদ্র সীমার নিচে থাকা মানুষদের নিমূল করা যেতে পারে, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে এই প্রথম ৷

হাসিনার ‘অর্থনৈতিক মডেল’ সম্পুর্ণভাবেই অর্থনৈতিক বিকাশ ও সামাজিক উন্নয়নের ইঙ্গিতবাহক ৷

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের পরিমাপ ৪৫ শতাংশ ৷ অন্যদিকে, শিক্ষাক্ষেত্রে মহিলার উপস্থিতি ৯৮ শতাংশ ৷ যা কিনা পুরুষদের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি ৷ ওয়ার্ল্ড ইকোনকিম ফোরাম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘লিঙ্গ সাম্যের দেশ’ বলে অভিহিত করেছে ৷ এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্থান ৪৭, মলদ্বীপ ১০৬, আর ভারত ১০৮-এ ৷

সংবাদমাধ্যমকে হাসিনা জানিয়েছেন, ‘আমরা গর্বিত ৷ আমার দেশের মহিলারা, দেশের বিকাশের মূল ধারক ও বাহক ৷ বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পা, যা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এবং এদেশের সর্বাধিক রপ্তানিতে সাহায্য করে, সেই বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের ৭০ শতাংশ মহিলারা ৷ ’ সঙ্গে হাসিনা বলেন, এই অর্থনৈতিক বিকাশ দেশের গরীব মানুষ ও বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশেরই উন্নতিসাধন করবে ৷

কৃষক ও ভ্যান রিক্সা চালকদের উদ্দেশ্যে হাসিনা জানান, ‘বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডই হল এই সব মানুষ ৷ যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ! ’

মার্কিন-চিনের বাণিজ্যিক যুদ্ধ বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলির বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকে বেশিরভাগ সময়ই লাভবান করছে ৷ তাই হাসিনা এই সুযোগকে কোনও মতেই হাত ছাড়া করতে রাজি নন ৷ হাসিনা পরিকল্পনা করছেন দেশের মধ্যে ১০০ টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন তৈরি করার ৷ যার মধ্যে ১১টি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে ৷ বাকি রয়েছে ৭৯টি ৷

বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুদানকে বাতিল করে, বাংলাদেশের নিজস্ব রাজকোষের অর্থেই পদ্মানদীর ওপর তৈরি হচ্ছে সেতু ৷ আগামী বছরের মধ্যেই তা তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে ৷ এই সেতু ২১টি জেলার সঙ্গে সংযুক্ত হবে ৷ বিশিষ্ট সম্পাদক স্বদেশ রায়ের কথায়, ‘শুধুমাত্র দেশের একটি নতুন সেতু নয়, এই সেতু বাংলাদেশের মানুষদের জন্য গর্বের বিষয় ৷ ’

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে উন্নততর রাস্তা, সেতু ৷ কখনও চিন থেকে আর্থিক সাহায্য, কখনও ভারত থেকে আর্থিক সাহায্য, আবার কখনও নিজস্ব রাজকোষের অর্থ দিয়েই বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিকাশসাধন করে চলেছে হাসিনা সরকার৷

হাসিনা ভারত ও চিনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সবসময়ই সমতা বজায় রেখে চলেছেন ৷ বস্ত্রশিল্পের পরেই বাংলাদেশ, সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রপ্তানি করে গোটা বিশ্বে ৷

বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের কথায়, ‘হাসিনা যেমনভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা ভাবছেন, কোনও নেতা তেমনভাবে ভাবেন না’ ৷ দাশগুপ্ত আরও বলেন, ‘হাসিনা তাঁর পিতা শেখ মুজিবর রহমনের মতোই ৷ তাঁর মতোই বাংলাদেশকে অর্থে সোনার বাংলা করে তুলে চান !’

শেখ হাসিনাকে নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র ‘হাসিনা: আ ডটার’স টেল’ মু্ক্তি পাওয়ার পরে উচ্চ প্রশংসা পায় ৷ যা কিনা নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে  ৷

প্রাইস ওয়াটার কুপার্স মনে করে, আগামী দুই শতকে বাংলাদেশ সবচেয়ে উন্নয়নমূলক দেশ হয়ে উঠবে ৷ আর সেই কারণেই হয়তো নির্বাচনে হাসিনার একমাত্র স্লোগান ‘উন্নয়ন এবং একমাত্র উন্নয়ন ৷’

নির্বাচনের আগে হাসিনার দলকর্মীদের মুখে একটাই স্লোগান আওয়ামি দলের পরাজয়ের অর্থই হল বিকাশকে থমকে দেওয়া ৷ আর বাংলাদেশকে ফের ২০০১-০৬-এর বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামি ‘কালো’ শাসনের দিকে ঠেলে দেওয়া ৷ যেখানে কিনা উগ্রপন্থা, আতঙ্কেরই একমাত্র বিকাশ ঘটে ৷

আওয়ামি লিগের জেনারেল সেক্রেটারি ওবাইদুল কুয়াদেরের কথায়, ‘ওরা (বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামি ) মানুষকে কী দিতে পারবে ? রক্ত আর চোখের জল ? আমরা যদি পরাজিত হই, তাহলে বাংলাদেশের বিকাশ কয়েকশো যুগ পিছিয়ে যাবে !’

নির্বাচনের আগে হাসিনা একদিকে উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা গণতন্ত্রের মন্ত্র উচ্চারণ করছে ৷

২০১৪ সালে বিএনপি ও তার সহযোগী পার্টি নির্বাচন বয়কট করেছিল ৷ তাদের দাবি ছিল হাসিনা সরকার নির্বাচন সুষ্ঠভাবে করতে দেয়নি ৷ তবে বিরোধীদের এই অভিযোগকে নসাৎ করে ৷ এর ফলে আগুন জ্বলেছিল গোটা বাংলাদেশে ৷ হাসিনা সরকারের বিরোধিতায় তীব্র প্রতিবাদ দেখা দিয়েছিল ৷ যা প্রাণ কেড়েছিল একশো মানুষের ৷

ঠিক এই সময়ই বিএনপি-র সঙ্গে যুক্ত হয় গণ ফোরাম (পিপলস ফোরাম) ৷ যা নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রাক্তন আওয়ামি লিগের নেতা কামাল হোসেন ৷ যিনি কিনা শেখ মুজিমর রহমের প্রতিদ্বন্ধি ছিলেন ৷ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল তীক্ত ৷ কামাল হাসনের মতে, ‘হাসিনা গত পাঁচ বছর ধরে গণতন্ত্রের মুখে ধুলো দিয়ে সরকার পরিচালনা করছেন ৷ গণতন্ত্রকে ফের বাংলাদেশে নিয়ে আসতে হবে ৷ সাধারণ মানুষের হাতে ভোটাধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে ৷’

অন্যদিকে, বিএনপি-র জেনারেল সেক্রেটারি রুহুল কবীর রিজভি মনে করেন, ‘নির্বাচনে জেতার জন্য হাসিনার সরকার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে বসে প্ল্যান তৈরি করেছে ৷ এমনকী, অতিরিক্ত ব্যালট পেপারও ছাপানো হয়েছে ৷ যা দিয়ে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করবে হাসিনা সরকার ৷’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘২০০,০০০ আওয়ামি লিগের কর্মীদের বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে ভোটের সময় বুথ অধিগ্রহণের জন্য ৷ ’

তবে উত্তরে আওয়ামি লিগের যুবনেতা সুফি ফারুখ জানিয়েছেন, ‘এসব একেবারেই ভ্রান্ত অভিযোগ ৷ আসলে বিরোধীরা জানতে পেরেছে, তাঁদের অস্তিত্ব বলে কিছুই নেই ৷ এমনকী, বুঝতে পারছে জনসাধারণ ঠিক কি চাইছেন ৷ সেই কারণেই নিজেদের ব্যর্থ মনোভাব পোষণ করছেন বিরোধী নেতারা ৷’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার মতে, হাসিনার সরকারে ফিরে আসার সম্ভাবনা ৬৬ শতাংশ, অন্যদিকে ২১ শতাংশ মানুষ চাইছেন বিএনপি-র খালেদা জিয়াকে ৷ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে আপাতত রয়েছেন হাজতে৷ অন্যদিকে, খালেদা পুত্র তারিক দেশ ছেড়ে লন্ডনে পলাতক ৷ ২০০৪ সালে হাসিনার ওপর গ্রেনেড আক্রমণের মামলায় খালেদা পুত্র তারিকও যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন ৷ সেক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিএনপি দল শীর্ষনেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে ৷

তবে গত দশ বছরে আওয়ামি লিগ পার্টির প্রতি বহু আনুগত্যের জন্ম দিয়েছে ৷ পার্টি টিকিট পাওয়ার জন্য তাই লড়াইটাও বেশিমাত্রায় ৷ সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত মনে করছেন, ‘এই বহু আনুগত্যই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আওয়ামি লিগের জন্য৷ এর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে দুর্নীতিও ৷’

First published: 08:19:54 PM Dec 10, 2018
পুরো খবর পড়ুন
Loading...
अगली ख़बर